হাইপেশিয়া: গণিতের প্রথম মহীরুহ নারী এবং একটি মর্মান্তিক মৃত্যুর ইতিহাস!

হাইপেশিয়া: গণিতের প্রথম মহীরুহ নারী এবং একটি মর্মান্তিক মৃত্যুর ইতিহাস!
 

‘নিজের চিন্তা করার অধিকারকে সংরক্ষণ করো। কারণ কিছু চিন্তা না করা থেকে ভুলভাবে চিন্তা করাও ভালো। মানুষ একটি সত্যের জন্য যতটা না লড়াই করে তার থেকে বেশি কুসংস্কারের জন্য করে। কারণ কুসংস্কার সবসময়েই অস্পৃশ্য এবং অসার, কিন্তু সত্য হচ্ছে আলাদা, আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি। তাই এটি পরিবর্তনশীল।’ – হাইপেশিয়া

ইতিহাস ঘাটাঘাটি করলে আমরা দেখতে পারি যে আধুনিক সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত সত্য উন্মোচনের পথকে রুদ্ধ করে রেখেছে একমাত্র ধর্ম। ধর্ম শুধু মাত্র সত্য উন্মোচনের পথে বাধাই প্রদান করেনি বরং যারাই সত্যকে উদ্ঘাটন করে মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেবার চেষ্টা করেছে তাদের প্রাণ পর্যন্ত কেড়ে নেয়া হয়েছে, অনেককে  সহ্য করতে হয়েছে পাশবিক এবং অমানবিক নির্যাতন। নিকোলাস কোপার্নিকাস, জিওর্দানো ব্রুনো, গ্যালিলিও, সক্রেটিস, আইনস্টাইন, লিসে মাইটনার সহ আরও অসংখ্য বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানীরা তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এটি ধর্মের একটি নিকৃষ্ট ইতিহাস, শুধু তাই নয় সে সময় নারীদেরকে যথাযত মর্যাদা দেয়া তো দূরের কথা মানুষ বলে কখনো মূল্যয়নই করা হতো না। ধর্ম আর পুরুষতান্ত্রিকতার প্রভাব যেন একই সুতোয় গাথা। মূদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। নারীদেরকে ভাবা হতো নিচু জাতের এক প্রাণি।

আসলে শুধু সেই সময় নয় এই আধুনিক সভ্যতার যুগেও কতজনই বা নারীর অবদানকে স্বীকার করে নেন বা নিয়েছেন। অথচ সেই সভ্যতার শুরু হয়েছিল নারী পুরুষের যৌথ কর্মের সমন্বয়ে । পুরুষের পাশাপাশি নারীও অবদান রেখেছে জ্ঞান, বিজ্ঞান, দর্শন, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান তথা প্রতিটি শাখায়। কিন্তু পুরুষত্বের বলে নারীদেরকে অগ্রাহ্য করা হয়েছে চিরটাকাল। তকমা দেওয়া হয়েছে নারীরা দুর্বল, বুদ্ধিহীনা। জ্ঞান বিজ্ঞানে তাদের পদাচরণ নেই বললেই চলে। অথচ আপনি কয়েক হাজার বছর এগিয়ে শুরুর দিকটা একবার ঘুরে আসুন। দেখবেন নারীদের অবদান কখনো কখনো পুরুষকেও ছড়িয়ে গিয়েছে। কিন্তু পুরুষ তাদেরকে আসন দেননি, কোথাও কোথাও তাদের আসন কেড়েও নিয়েছে শক্তি এবং সংখ্যাগরিষ্টতা  দেখিয়ে। পুরুষ আর ধর্ম মিলে নারীদেরকে অবমাননা করেছে পুতুলতুল্য করে।

আর সে কারণেই তো আমরা দেখতে পাই- লিসে মাইটনার, রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিন, মাদাম কুরি, লরা বেসি, সোফিয়া কোলেভাস্কা, লিস মিন্টার, ক্যারলিন হারসেল, মেরি অ্যানি ল্যাভরশিয়ে, লিজা রান্ডল, এরকম অসংখ্য নারীদের বিজ্ঞান জগতে অবিস্মরণীয় আবিষ্কার এবং কর্ম থাকা সত্ত্বেও তাদের অবদানকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়েছে। এমনকি কখনো কখনো তাদের অনেকেরই কর্মের প্রাপ্য ফসল নোবেল পর্যন্ত দেয়া হয়নি শুধু নারী হবার কারণে (যদিও পরবর্তী সময়ে নানান আলোচনা, সমালোচনার মুখে মাদাম কুরিকে অবশেষে নোবেল কমিটি নোবেল পুরস্কার দিতে বাধ্য হয়েছিল)। অটোম্যান স্ট্যানলি তার “মাদারস এন্ড ডটার অব ইনভেনশন” বইতে এ রকম সংখ্য নারীর অবদান এবং তাদের অবহেলাকে তুলে ধরে দেখিয়েছিলেন যে পুরুষদল যাই কিছু কর্ম করেছে, আবিষ্কার করেছে ইতিহাস তাকে যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ করে রেখেছে? আর নারীদের অবদান আর আবিষ্কারকে পাশ কাটিয়ে গেছে চিরকাল।

ঠিক তেমনিভাবে নিকৃষ্ট, ধর্মীয় কদাচারের আক্রোশ এবং পুরুষতান্ত্রিকতার ঘৃণ্য শিকার এক মহান নারী বিজ্ঞানীর সম্পর্কে আজ আমরা জানার চেষ্টা করব। তিনি ইতিহাসের প্রথম এবং পূর্ণাঙ্গ নারী গণিতজ্ঞ এবং দার্শনিক ছিলেন। নাম তার হাইপেশিয়া। তাহলে চলুন কথা না বাড়িয়ে মূল আলোচনায় যাওয়া যাক…

হাইপেশিয়া : প্রাথমিক পরিচিতি

আনুমানিক ৩৭০ খ্রিস্টাব্দে প্রাচীন মিশরের আলেক্সান্দ্রিয়া শহরে জন্মগ্রহণ করেন হাইপেশিয়া। পিতার নাম থিওন। থিওনও ছিলেন একজন গণিতজ্ঞ, আলেক্সান্দ্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের অধ্যাপক এবং বিখ্যাত আলেক্সান্দ্রিয়া মিউজিয়ামের পরিচালক। হাইপেশিয়ার মৌলিক শিক্ষা, এবং বেড়ে ওঠার পিছনে তার পিতার ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। ধর্মীয় করালগ্রাস, পুরুষতান্ত্রিকতার চরম বর্বর যুগেও তার বাবা চেয়েছিলেন হাইপেশিয়া শুধুমাত্র নারী না হয়ে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে, বিজ্ঞানমনস্ক, দর্শন এবং যুক্তিসম্পন্ন একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠুক। অবশ্য তিনি পূর্ণাঙ্গ মানুষ তো হয়েছিলনেই, উপরন্তু সব কিছুকেই ছাড়িয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন ইতিহাসের একজন বিখ্যাত গণিতজ্ঞ হিসেবে। তার অসম্ভব মেধা, যুক্তি, বাগ্মীতা, আবিষ্কারের এর সাথে সৌন্দর্য মিশিয়ে হয়ে উঠেছিলেন ৪০০ সালের একজন শ্রেষ্ট নব্য প্লেটোবাদী দার্শনিক হিসেবে।

হাইপেশিয়ার গবেষণাকাল এবং বর্ণাঢ্য জীবনের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা:

বাবার পরামর্শে বিভিন্ন বিষয়ে বাস্তবিক জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে হাইপেশিয়া বেড়িয়ে পড়েন পুরো রোমান সাম্রাজ্য ঘুরতে। রোমান সাম্রাজ্য ঘুরতে ঘুরতে তিনি চলে যান এথেন্সে এবং সেখানে গিয়ে গ্রিসের একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। এখানেই হাইপেশিয়া প্রচুর জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। এই সময়েই তার খ্যাতি গ্রিস কে ছাড়িয়ে আলেক্সান্দ্রিয়ায় এসে পৌঁছালে তাকে আলেক্সান্দ্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতের শিক্ষক হিসেবে অধ্যাপনার প্রস্তাব পেশ করা হয়। পরবর্তীতে তিনি আলেক্সান্দ্রিয়ায় ফিরে আসেন এবং আলেক্সান্দ্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগে অধ্যাপনা শুরু করেন। বিখ্যাত গণিতবিদ দায়োফ্যান্তাস রচিত এরিথমেটিকা বইয়ের উপর তিনি ১৩ অধ্যায়ের একটি আলোচনা লিখেন যার কিছু অংশ পরবর্তীতে দায়োফ্যান্তাইন বইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এ ছাড়াও তিনি এপোলোনিয়াসের কৌণিক ছেদ এবং টলেমির জ্যোর্তিবিদ্যার অসংখ্যা কাজের উপর বেশ কিছু আলোচনা প্রকাশ করেন। বিখ্যাত ‘স্যুডা’ বইটিও তার রচনা বলে অনেকর অভিমত আছে।

হাইপেশিয়ার বাবা আলেক্সান্দ্রিয়া মিউজিয়াম এবং লাইব্রেরি পরিচালক হওয়ায় হাইপেশিয়ার প্রবেশ অধিকার ছিল অবাধ। টলেমি, অ্যারিস্টটল, প্লেটোর কাজের উপর তিনি লাইব্রেরির একটি কক্ষে আলোচনা করতেন প্রতিনিয়ত। তার আলোচনা শোনার জন্য অনেক দূর-দুরান্ত থেকে লোকজন ছুটে আসতেন। তখনকার সময়ে হাইপেশিয়ার বক্তব্য শুনতে হতো টাকা দিয়ে। তার মেধা যেমন ছিল অসাধারণ, তেমনি যুক্তিও ছিল সুপষ্ট। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি আলেক্সান্দ্রিয়ার শ্রেষ্ট নব্য প্লেটোবাদী দার্শনিক এবং গণিতজ্ঞ হিসেবে অধিষ্ঠিত হোন। অনেকেই তার বক্তব্য শুনে আকৃষ্ট হয়ে এবং তার প্রতিভায় মুগ্ধ হয়েছে আজীবন একনিষ্ট অনুরাগী হিসেবে থেকেছেন। শিক্ষক হিসেবেও তিনি ছিলেন শ্রেষ্ট। সকল শিক্ষার্থীরাই তাকে ভালোবাসতেন অসম্ভব। তার প্রিয় ছাত্রদের মধ্যে অন্যতম একজন সিরিনের সাইনেসিস। যিনি পরবর্তীতে ‘টলেমাইস’ নামক একটি অঞ্চলের বিশপ হয়েছিলেন। হাইপেশিয়ার মৃত্যুর পর তার অসংখ্য কর্মের প্রমাণ পাওয়া যায় এই সিরিনের লেখা চিঠিপত্র থেকে। জ্যামিতির কালজয়ী গ্রন্থ “ইউক্লিডস এলিমেন্ট”(Euclidas element) এর নতুন সংস্করণ তৈরিতেও বাবা থিওনকে সহায়তা করেছেন হাইপেশিয়া। এ ছাড়াও তার বাবার সাথে যৌথভাবে টলেমির “আলমাগসেট” (Almagset) গ্রন্থের উপর কাজ করেছেন এক সাথে।

শুধুমাত্র গণিতের কাজ কিংবা দর্শন কিংবা জ্যোর্তিবিদ্যার উপর গবেষণা, কাজ ও আলোচনা ছাড়াও তিনি বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখাতেও অবদান রেখেছেন অসামান্য। তিনি একটি অ্যাস্ট্রোল্যাব (যা দিয়ে মহাজাগতিক নানান সমস্যার সমাধান এবং গ্রহ, নক্ষগুলোর ঘূর্ণন নির্ণয়ে কাজ করা হতো) এবং একটি হাইড্রোস্কোপ (যা দিয়ে তরল পদার্থের আপেক্ষিক গুরুত্ব পরিমাপ করা যেত) আবিস্কার করেন। হাইপেশিয়ার কর্মে মুগ্ধ হয়ে মার্গারেট এলিক তার “Hypathia’s heritage” গ্রন্থে হাইপেশিয়াকে বর্ণনা করেছেন মাদামকুরির পূর্ববর্তী সব থেকে উল্লেখযোগ্য এবং শ্রেষ্ঠ নারী বিজ্ঞানী হিসেবে। আবার অন্য একটি প্রবন্ধে (Women and Technology in Ancient Alexandria : Maria and Hypatia) মার্গারেট এলিক বলেছেন, ‘Hypatia was a scholarly pagan and a woman, an espouser for Greek scientific rationalism and an influential political figure. This proved to be a dangerous combination.’

৪০০ সালে হাইপেশিয়াই প্রথম সকল প্রকার ধর্মীয় কুসংস্কার এবং কূপমন্ডুকতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বিজ্ঞানকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। বিজ্ঞানকে আলাদা করেছেন ধর্ম থেকে এবং প্রতিকায়িত করেছেন নতুন এক পূর্ণাঙ্গ সংজ্ঞায়। আর একারণেই লেখক জন উইলিয়াম ড্র্যাপার বলেছিলেন, ‘হাইপেশিয়া ছিলেন ধর্মের বিপরীতে বিজ্ঞানের নিবিড় সমর্থক।’

হাইপেশিয়া মনে করতেন ধর্ম সেটাই যা সত্যকে আবিষ্কার করে। সত্যিকারের বিজ্ঞানমনস্ক, যুক্তিনির্ভর করে তোলে এবং বিজ্ঞানকে প্রতিষ্ঠিত করে।হাইপেশিয়া তার এক শিষ্যকে বাইবেল সম্পর্ক বলেছিলেন, ‘আমি খ্রিস্টান নই, কিন্তু বাইবেলের প্রাচীন এবং নবীন দুটো খণ্ডই আমি পড়েছি। আব্রাহাম ইয়াকুব ইউসুফ ধর্মই বলো, আর যিশু খ্রিস্টের ধর্মই বলো, অহংকার না করেও আমি বলতে পারি ও দুটির মর্মই আমি উপলব্ধি করেছি। বিশ্বাসের কথা, ঈশ্বরের প্রেমের বাণী ও দুটিতে আছে ঢের, কিন্তু দার্শনিকের দৃষ্টিতে ওসব বাকসুলভ উচ্ছ্বাস ছাড়া আর কিছুই নয়। পরিণত বুদ্ধির জাতির জন্য থাকা উচিত- যুক্তিনির্ভর জ্ঞানভিত্তিক একটা ধর্ম, যা ছিল গ্রিকদের। যার পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংকল্প নিয়ে আমি যথাসাধ্য কাজ করে যাচ্ছি আলেক্সান্দ্রিয়ায় বসে।’

একই কথা অন্যরকম ভাবে বলেছেন আর একটি যায়গায়, ‘রুপকথাকে রুপকথা হিসেবে, পুরাণকে পুরাণ হিসেবে এবং অলৌকিকতাকে অলৌকিকতা হিসেবেই শেখানো উচিত। কারণ শিশুর মন সেগুলো বিশ্বাস করে নেয় এবং পরবর্তীতে কোনো বড় আঘাত বা দুর্ঘটনাই সেগুলো মন থেকে মুছতে পারে!’

হাইপেশিয়া তার শিক্ষার্থীদের কে দায়োফ্যান্তাস, এরিথমেটিকা শেখাতেন। টলেমি, প্লেটোর বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাদের সাথে আলোচনা করতেন। হাইপেশিয়া মূলত তার শিক্ষার্থীদেরকে বাস্তবিক শিক্ষার বুনিয়াদ গঠনের উপর বেশি করে গুরুত্বারোপ করেছিলেন। বিদুষী এই নারী শুধু গুণেই নয় রূপেও ছিলেন অসম্ভব সুন্দরী। রূপের গুণে তাকে অভিধা করা হত পরমাসুন্দরী আফ্রোদিতির দেহে ঠিক প্লেটোর আত্মা যেন!  রূপে, গুণে, কর্মে, অনেকেই আকৃষ্ট হয়েছেন তাকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পাবার জন্য। কিন্তু এ যে আফ্রোদিতির দেহে প্লেটোর আত্মা, জুনোর মতো জ্ঞানময়ী, মিনার্ভার মতো মর্যাদাময়ী। তার দরকার জ্ঞান সাধনা, সত্যকে অনুসন্ধান, আহরণ এবং পরিশেষে তা সকলের মাঝে বিলিয়ে দেয়া। তাতে যেন ব্যাঘাত না ঘটে কিছুতেই। আর সে কারণেই তিনি সকল প্রস্তাব কে প্রত্যাখ্যান করে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন বিবাহ নামক জঞ্জাল থেকে।

ধর্মীয় করালগ্রাস, নিকৃষ্ট রাজনীতি এবং হাইপেশিয়ার মৃত্যু:

হাইপেশিয়ার মৃত্যু মূলত নিকৃষ্ট ধর্মীয় রাজনীতির কুফল। এটি ইতিহাসের নিকৃষ্ঠ হত্যাকাণ্ডগুলোর মধ্যে একটি। যে হত্যাকাণ্ডের লোমহর্ষক বর্ণনা শুনলে শরীরের স্নায়ুতন্ত্র অবশ হয়ে যায়, আর তা যদি হয় হাইপেশিয়ার মতো একজন মহামতীর ক্ষেত্রে? তখন সবেমাত্র খ্রিস্টানরা আলেক্সান্দ্রিয়ায় আধিপত্যের বিস্তার শুরু করেছে। তারা নানান ভাবে প্যাগান, ইহুদিদের উপর নির্যাতন এবং জুলুম শুরু করেছেন। আর হাইপেশিয়াও ছিলেন একজন প্যাগান। ঘটনার শুরুটা হয়েছিল ৩৮০ সালের শুরু দিকে। সম্রাট থিওডোসিয়াস তখন প্যাগানবাদ এবং অরিয়ানবাদদের বিরুদ্ধে অসহিষ্ণু নীতির চালু করেছেন। রীতিমতো একটি যুদ্ধ ঘোষণা করার মতো। তিনি ৩৮৯ সাল থেকে ৩৯২ সাল পর্যন্ত পূর্ব রোমান অঞ্চলীয় এবং পরবর্তীতে ৩৯৫ সাল পর্যন্ত তিনি পূর্ব এবং পশ্চিম উভয় অঞ্চলের শাসন করেন। ৩৯১ সালে তিনি আলেক্সান্দ্রিয়ার বিশপ থিওফিলাসের এক পত্রের জবাবে  মিশরের সমস্ত ধর্মীয় স্থানসমূহগুলোকে ধ্বংস করে দেওয়ার আদেশ জারি করলে উন্মাদ খ্রিস্টানের দল গুলো এক এক করে ধ্বংস করে দেয়া শুরু করেন সব। পরবর্তিতে ৩৯৩ সালে আইনসভায় এক আইনের প্রণয়নের মাধ্যমে এই ধ্বংসযজ্ঞ বন্ধ করলে বেশ কিছুদিন শান্তিতে বসবাস করে মিশরের জনগণ।

৪১২ সালে আবার আলেক্সান্দ্রিয়ার নতুন বিশপ বা পেট্রিয়ার্ক হিসেবে আসেন সিরিল। সিরিল আসার পরেই আবার নতুন করে শুরু হয় সেই ধ্বংসযজ্ঞ। সিরিলের ধ্বংসযজ্ঞ যেন আরও ভয়ংকর, আরও কঠিন। সিরিল হাইপেশিয়াকে পছন্দ করতেন না কখনোই। মূলত হাইপেশিয়ার দর্শন, হাইপেশিয়ার বিজ্ঞান মনস্কতা, হাইপেশিয়ার যুক্তি এবং হাইপেশিয়ার বক্তব্যকে তিনি সর্বদায় ভয় করতেন। তিনি ভাবতেন এই এক সামান্য মহিলা যে কিনা একাই পুরো আলেক্সান্দ্রিয়ায় খ্রিস্টানদের ভীত কাঁপিয়ে দিচ্ছেন। সিরিলের অনুসারীদেরকেও হাইপেশিয়া আকৃষ্ট করতেন তার সুস্পষ্ট যুক্তিবোধ দ্বারা। সিরিল ভাবতে শুরু করলেন এভাবে যদি চলতে থাকে তাহলে তার খ্রিস্টান ধর্ম প্রচারে ব্যাঘাত ঘটবে, ধ্বংস হয়ে যাবে, পরাজিত হবে এই নারী এবং বিজ্ঞানের কাছে। চার্লস কিংসলের উপন্যাস (Hypatia and or the new foes with an old face (1853)) থেকে জানা যায় বিশপ সিরিল খ্রিস্টান ধর্মনুরাগী তরুণদের হাইপেশিয়ার বক্তব্য শুনতে যেতে নিষেধ করতেন। তার ভয় হতো যে হাইপেশিয়ার প্রবল ব্যক্তিত্ব আর তীক্ষ্ম যুক্তির কাছে খ্রিস্ট ধর্মের দার্শনিক ভিত্তির দুর্বলতা প্রকাশিত হয়ে যাবে। কিংসলে তার উপন্যাসে এ রকম একজন তরুণের উদাহরণও দিয়েছেন। তরুণের নাম ফিলামন। একজন  খ্রিস্টান সন্ন্যাসী। কোনো একদিন তিনি হাইপেশিয়ার বক্তৃতা শুনতে যাবার ইচ্ছে পোষণ করলে সিরিল তাকে নিষেধ করেন এবং হাইপেশিয়া সম্পর্কে এই ধারণা দেন যে, হাইপেশিয়া সাপের থেকেও ধূর্ত এবং সব ধরনের চালাকিতে পটু এক মহিলা। তুমি যদি ওখানে যাও তবে নিজেকে ঠাট্টার পাত্র মনে হবে আর লজ্জায় পালিয়ে আসবে।

অবশ্য সিরিলের নিষেধকে উপেক্ষা করে ফিলামন গিয়েছিলেন তার সভায়। বক্তৃতা শুনে পালন করতে নয় হাইপেশিয়াকে ধর্ম দিয়ে বধ করতে। অবশেষে নিজেই বধ হয়েছিলেন হাইপেশিয়ার যুক্তি, জ্ঞান, দর্শন আর বিজ্ঞানের কাছে। ফিলামন শেষ পর্যন্ত হাইপেশিয়ার একজন অনুরাগী হয়ে ছিলেন হাইপেশিয়ার মৃত্যু পর্যন্ত। হাইপেশিয়ার এই জনপ্রিয়তা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি বিশপ সিরিল। এ ছাড়াও আলেক্সান্দ্রিয়ার নগর পিতা অরিস্টিসের সাথে হাইপেশিয়ার ছিল গভীর বন্ধুত্বের সম্পর্ক। হাইপেশিয়ার বুদ্ধিমত্ত্বায় এতই আপ্লুত ছিলেন যে অরিস্টিস, যেকোনো সিদ্ধান্ত তিনি একা নিতেন না কখনো, কিংবা যেকোনো কাজ হাইপেশিয়াকে না জানিয়ে করতেন না। অন্যদিকে অরিস্টিসের সাথে সিরিলের ছিল শত্রুতার সম্পর্ক। অনেকেই হাইপেশিয়ার সাথে অরিস্টিসের এই সম্পর্ককেও বিশপের আক্রোশের আর একটি কারণ বলে মনে করেন। পুরুষতান্ত্রিক সেই সমাজে হাইপেশিয়ার বীর বেশে প্রবেশ এবং অবস্থান, প্রকাশ্যে নব্য প্লেটোনিজম প্রচার, খ্রিস্ট ধর্মের অসারতা নিয়ে আলোচনা, প্রত্যেক মানুষকে যুক্তিনির্ভর এবং স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে আগ্রহ প্রদান এসবই কাল হয়ে দাঁড়াল মহামতী বিদূষী এই নারীর জন্য। অবশেষে উন্মত্ত বিশপ হাইপেশিয়াকে পৃথিবী থেকে চিরবিদায় করবার পরিকল্পনা করেন এবং এক সময় এক নারকীয় হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে হাইপেশিয়াকে পৃথিবী থেকে চিরদিনের মতো সরিয়ে ফেলেন। যদিও তিনি সরাসরি হত্যা করেননি, তার অনুসারীদের দিয়ে করিয়েছেন বলে প্রচলিত আছে। সক্রেটিসের স্কলাসটিকা থেকে হাইপেশিয়ার মৃত্যুর এ রকম একটি বর্ণণা পাওয়া যায়, ‘পিটার নামে এক আক্রোশী ব্যক্তি অনেক দিন ধরেই তক্কে তক্কে ছিল। অবশেষে সে হাইপেশিয়াকে কোনো এক জায়গা থেকে ফিরবার পথে কাবু করে ফেলে। সে তার দলবল নিয়ে হাইপেশিয়াকে তার ঘোড়ার গাড়ি থেকে টেনে-হিঁচড়ে, কেসারিয়াম নামের একটি চার্চে নিয়ে যায়। সেখানে তারা হাইপেশিয়ার কাপড়-চোপড় খুলে একেবারে নগ্ন করে ফেলে। তারপর ধারালো অস্ত্রের সাহায্যে তার চামড়া ছিলে ফেলে, তার শরীরের মাংস কেটে ফেলে আর শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করার আগ পর্যন্ত হাইপেশিয়ার উপড় তাদের অকথ্য অত্যাচার চলতে থাকে। এখানেই শেষ নয়, মরে যাবার পর হাইপেশিয়ার মৃতদেহকে টুকরো টুকরো করে সিনারন নামের একটি জায়গায় জড়ো করা হয়, আর তারপর তা পুড়িয়ে ছাই করে দেয়া হয়।’

সারাহ জেইলিন্সকি নামক একজন লেখক লিখেছেন, ‘৪১৫ কিংবা ৪১৬ সালের একদিন মিশরের আলেক্সান্দ্রিয়া শহরের রাস্তায় পিটার দ্য লেকটরের নেতৃত্বে খ্রিস্টান চরমপন্থীদের একটি দল একজন নারীকে বহনকারী একটি ঘোরার গাড়ি ঘিরে ফেলে এবং তাকে টেনে-হিঁচড়ে বের করে একটি গির্জায় নিয়ে তোলে। সেখানে তারা তাকে উলঙ্গ করে মৃত্যু নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তার দিকে ছাদের টালি নিক্ষেপ করে!’

কী বীভৎস ধর্মের নামে সেই মৃত্যু! কী ভয়ানক সেই পুরুষতান্ত্রিকতার অহংকার! এ যেন শুধু একটি মৃত্যু নয়, একটি যুগের অবসান। বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত থেকে জানা যায় হাইপেশিয়ার মৃত্যুর পর পুরো ইউরোপ থমকে দাঁড়ায়। নিভে যায় বিজ্ঞান আর দর্শনের আলো। কম করে হলেও পরবর্তী ১০০০ বছর বিজ্ঞানের কোনো অগ্রগতি হয়নি তো বটেই বরং পিছিয়েছে অনেক। ধর্মীয় কূপমন্ডুকতা, কুসংস্কারের অবাধ চর্চা হয়েছে এই দীর্ঘ এক হাজার বছর ধরে। ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে আলেক্সান্দ্রিয়ার জ্ঞানচর্চার ওই পবিত্র স্থান আলেক্সান্দ্রিয়া মিউজিয়াম ও লাইব্রেরি। পুড়িয়ে ফেলা হয় ফেলা হয় সমস্ত বই, তথ্য এবং উপাত্ত। অবশ্য থিওনের কিছু কিছু বই উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল। তারপর বহু বছর পেরিয়ে গেছে। হাইপেশিয়াকে ভুলে গেছে সকলেই, ভুলে গেছে তার অবদান। এমনই এক সংকটকালীন সময়ে ১৭২০ সালের কোনো এক দিনে আগন্তুকের মতো এসে পড়েন জন টোনাল্ড নামক একজন লেখক। তিনি, ‘Hypatia or the History of a most beautiful, most virtuous, most learned and in every way accomplished lady; who was torn to pieces by the clergy of Alexandria to gratify the pride, emulation and cruelty of the archbishop commonly but undeservedly titled St Cyril.’ নামক একটি শিরোনামে হাইপেশিয়াকে তুলে নিয়ে আসেন ডুবে যাওয়া সেই অন্ধকার সাগরের অতল গহ্বর থেকে। টোনাল্ড বলেন, ‘সেইন্ট বা সন্ত নামধারী পুরুষতন্ত্রে দীক্ষিত এক বিশপ ছিলেন এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা, আর শিষ্যরা ছিলেন তাদের গুরু জিঘাংসা চরিতার্থ করার নিয়ামক।’

ভলতেয়ার তার, ‘Examen Important De Milord Bolingbroke Ou Le Tombeau Du Fanatisme (১৭৩৬)’ বইয়ে লিখেছেন, ‘এই পাশবিক হত্যাকাণ্ড পরিচালিত হয় সিরিলের মাথা মুড়ানো ভিক্ষু হিসেবে খ্যাত কতগুলো ডালকুত্তার সহচর্যে, আর উগ্র, গোড়া ধর্মবাদীদের আস্ফালনে।’

পরবর্তীতে অবশ্য হাইপেশিয়ার যথাযথ মর্যাদা, তার কর্মের গুরুত্ব এবং ইতিহাসে তার প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরে লেখালেখি হয়েছে বিস্তর। যদিও বা বাংলাতে তার তেমন কিছুই হয়নি। বার্ট্রান্ড রাসেলের (হিস্ট্রি অব ওয়েস্টার্ন ফিলোসফি), এন্তারের এডওয়ার্ড গিবন (দ্যা ডিক্লায়েশন এন্ড ফল অব রোমান এম্পায়ার), দামাস্কিউয়াস (সুদা), হেনরি ফিল্ডিং (আ জার্নি ফ্রম দিস ওয়ার্ল্ড, টু দ্যা নেক্সট), চার্লস লিকন্ড দ্যা লিসল (Hypatie : Hypatie et Cyrille), সহ এ রকম অসংখ্য নাটক, কবিতা, প্রবন্ধ, উপন্যাস রচিত হয়েছে। তার স্মরণে এখনো দুটি বিখ্যাত গবেষণা সাময়িকী প্রকাশিত হয়। একটি- ‘হাইপেশিয়া : ফেমিনিস স্টাডিস’। অপরটি ‘এ জার্নাল অব ফেমিনিস্ট ফিলোসফি’। ২০০৯ সালে হাইপেশিয়ার জীবন ও কর্ম নিয়ে ‘এগোরা’ নামক একটি স্প্যানিশ চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছিল, যা কিনা ১৩টি গয়া পুরস্কারের জন্য মনোনিত হয়ে ৭ টি জিতে নিয়েছিল।

এক জন মানুষ কিংবা নির্দিষ্ট আদর্শের অনুসারী কাউকে হত্যা করা যায় হয়তো, কিন্তু আদর্শ চেতনাকে? সেটাকে কি কখনো হত্যা করা যায়? হত্যা করা গেছে কখনো? ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে হাইপেশিয়া সহ সকল অবহেলিত এবং নির্যাতিত বিজ্ঞানীরা। আবার নতুন করে, নতুন বিশ্বে লেখায় লেখায় উঠে আসবে অমলিন সেই সকল নারী বিজ্ঞানীদের কথা।

তথ্যসূত্র:

লিখেছেন:  বিপ্লব হোসাইন 

আরও পড়ুন: মহেন্দ্রলাল সরকার : একজন উপমহাদেশীয় বিজ্ঞানীদের চাষা!

Facebook Comments
পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন: