স্লিপিং প্যারালাইসিস – ঘুমের মধ্যে বিপদ!

স্লিপিং প্যারালাইসিস – ঘুমের মধ্যে বিপদ!
 

স্লিপিং প্যারালাইসিস আমার নিজের অভিজ্ঞতা। আমি আমার নিজের থেকেই জানি। একটা সময় আমি দিনের বেলাও ঘুমাতে পারতাম না। ঘুম আসলেই মনে হতো উল্টাপাল্টা দেখছি। অনেক সময় কেউ একজন আমাকে মেরে ফেলতে আসছে। আবার কখনো দেখতাম খুব উঁচু থেকে পড়ে যাচ্ছি। কিংবা কোনো এক বিপদ দেখতে পাচ্ছি। এটার সম্পর্কে জানতাম তখন বোবায় ধরা নামে। রোগ যেহেতু ভৌতিক, ট্রিটমেন্টও চলতো ভৌতিক ভাবেই।  তাবিজ পরা, সূরা পড়া এসব।

বোবায় ধরা আসলে কী?

বোবায় ধরা বা স্লিপিং প্যারালাইসিস স্রেফ ইন্দ্রিয়ঘটিত ব্যাপার। যখন শরীর গভীর ঘুমের একটি পর্যায় থেকে আরেকটি পর্যায়ে প্রবেশ করে, তখনই এটি ঘটে থাকে। ‘বোবা ধরা’ কথাটা শুনতে একটু অদ্ভুতই লাগে। তবে কম-বেশি সবাই এর সঙ্গে পরিচিত।

মধ্যরাতে হঠাৎই ঘুম ভেঙে গেল। অনুভব করলেন, আপনার বুকের ওপর ভারী কিছু বসে আছে। এত ভারী কিছু যে ঠিকঠাক নিশ্বাসই নিতে পারছেন না আপনি। কেমন লাগবে তখন? নিশ্চয়ই খুব ভয় পাবেন! এটি ভীতিকর একটা পরিস্থিতি বটে। যখন টের পেলেন, আপনি চাইলেও শরীরের কোনো অংশ নাড়াতে পারছেন না, এমনকি চিৎকারও করতে পারছেন না। নিজেকে এমন অসহায়ভাবে আবিষ্কার করলে ভয় পাওয়াটাই স্বাভাবিক।

এমন অবস্থায় আপনার মনে হতেই পারে, ভূত বলে পৃথিবীতে কিছু আছে। আপনি যেহেতু নিজের চোখেই দেখেছেন। এমনকি গন্ধও পেতে পারেন। দেখা গেল, ঘুমের মধ্যেই নাকে বিচ্ছিরি একটা গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। পরিচিত কণ্ঠও স্পষ্ট শোনা যায়। কোনো প্রাণি চোখের সামনে স্পষ্ট দেখা যায়। এই সময় হ্যালুসিনেশনের মতো একটা অবস্থার সৃষ্টি হয়। গভীর ঘুমের একটি পর্যায় থেকে আরেকটি পর্যায়ে যাওয়ার সময় মস্তিষ্ক সতর্ক হয়ে ঘুম ভেঙে গেলেও শরীর আসলে তখন ঘুমেই থাকে। ফলে অনুভূতিটা অন্যরকম থাকে। বিশেষ করে ইন্দ্রিয় তখন আচ্ছন্ন থাকায় মানুষ অদ্ভুত কিছু দেখে এবং শ্বাসকষ্ট অনুভব করে। সাধারণত যাদের ঘুমের সমস্যা থাকে, তারাই বেশি স্লিপিং প্যারালাইসিস রোগে ভোগে। অনেকেই বিশ্বাস করে যে অলৌকিক কোনো কিছু এর জন্য দায়ী। আসলে এটি স্রেফ একটি শারীরবৃত্তীয় ব্যাপার। অন্য কিছু নয়।

স্লিপিং প্যারালাইসিস
                                                                                                                           স্লিপিং প্যারালাইসিস

স্লিপিং প্যারালাইসিস কেন হয়?

মানুষ যখন ঘুমায় তখন ঘুমের মাঝে REM (rapid eye movements) চক্র চলতে থাকে। মানুষের স্বপ্ন দেখার পর্যায়কেই বলা হয় REM। মানুষ ঘুমের মধ্যে এই চক্রে থাকাকালে মস্তিষ্ক শরীরের কার্যকলাপ বন্ধ করে রাখে। কারণ, স্বপ্ন দেখে মানুষ সেসবের রি-অ্যাকশন হাত-পা নাড়িয়ে করতে পারে। আর এতে নিজের দেহের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই স্বপ্নে আমরা হাঁটাহাঁটি, দৌড়াদৌড়ি, মারামারি যাই-ই করি না কেন, বাস্তবে ঘুমের সময় আমাদের শরীর কিন্তু স্থির হয়ে থাকে।

যদি কখনো REM চক্র চলাকালে শরীরের কার্যকলাপ বন্ধ না থাকে, তখন অনেকেই ঘুমের মাঝে চিৎকার করে, হাত-পা ছোড়াছুড়ি করে। ঠিক তেমনি বিপরীতভাবে অনেক সময় দেখা যায়, মানুষ ঘুম থেকে ঠিকই জেগে ওঠে কিন্তু তখনো শরীরের কার্যকলাপ বন্ধ থাকে। শরীর বুঝতে পারে না যে সে জেগে উঠেছে। ঘুম থেকে জেগে উঠলেও একই সঙ্গে শরীর যেমন বুঝতে পারে না ঠিক সেভাবেই REM চক্রও চলতে থাকে। যখন দুটো একসঙ্গে হয় সেই অবস্থাকেই বলে ‘বোবায় ধরা’। এই অবস্থা কয়েক সেকেন্ড থেকে কয়েক মিনিট পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

REM চক্র যখন চলে মানুষ তখন তার অভিজ্ঞতা থেকে নানা কিছু স্বপ্নে দেখে। কিন্তু মানুষ যদি জেগে জেগে স্বপ্ন দেখে তাহলে ব্যাপারটা কেমন দাঁড়ায়? হ্যাঁ ঠিক তাই, মানুষ জেগে থাকলে বাস্তবে স্বপ্নের জিনিসগুলো দেখতে পায়। আর মানুষ যেহেতু স্বপ্নে তার বাস্তব অভিজ্ঞতার একটা মিশ্র রূপ দেখতে পায়, তা-ই বাস্তবে সেসব আজগুবি-অলৌকিক জিনিসপত্র দেখতে পায়। যাকে ‘হ্যালুসিনেশন’ বলা হয়।

ধরুন আপনি স্বপ্ন দেখছেন। কী দেখছেন সেটা নির্ভর করে আপনার দৈনন্দিন কাজের ওপর। আপনি বাস্তবে গরুও দেখেছেন, ছাগলও দেখেছেন। স্বপ্নে গরুর দেহে ছাগলের মাথা দেখাটা তাই অস্বাভাবিক কিছু না। কারণ স্বপ্নে বাস্তবের জিনিস হুবহু দেখার সঙ্গে অনেক সময় একটা মিশ্র চিত্রও তৈরি করে। যা-ই হোক, স্বপ্নে গরুর দেহে ছাগলের মাথা মানা যায়। কিন্তু বাস্তবে যদি দেখেন, তখন? এমন সময়েই মানুষ অশরীরী বা অলৌকিক বস্তুর অবতারণা করে। আর ঘুম থেকে জেগে উঠে যদি REM চক্র চলতে থাকে, তাহলে এমন গরুর দেহে ছাগলের মাথা বাস্তবেও দেখা সম্ভব, যেহেতু স্বপ্ন দেখার পর্ব এখনো শেষ হয়নি।

তাহলে আসল ব্যাপারটা হলো, স্বাভাবিকভাবে স্বপ্ন দেখার সময় REM চক্র চলে আর এ সময় শরীরের স্বাভাবিক কার্যকলাপ বন্ধ থাকে। কিন্তু এই অবস্থার ব্যাঘাত ঘটলেই বোবায় ধরে আর হতে পারে ‘হ্যালুসিনেশন’।

স্লিপিং প্যারালাইসিস থেকে পরিত্রাণের উপায়

এটা হওয়ার অন্যতম কারণই হচ্ছে অনিয়মিত ঘুম, মানসিক অস্থিরতা, স্ট্রেস, অতিরিক্ত পরিশ্রম ইত্যাদি। তাই এর থেকে পরিত্রাণ পেতে আগে এই ব্যাপারগুলো থেকে মুক্ত হোন। মানসিক শান্তির জন্য প্রার্থনা কিংবা মেডিটেশন করুন। অতিরিক্ত কাজের চাপ নেবেন না! পর্যাপ্ত পরিমাণ বিশ্রাম নিন।  আর প্রতিদিন রাতে তাড়াতাড়ি ও একই সময়ে ঘুমান, ভোরবেলা উঠে ব্যায়াম করুন! ইংরেজিতে প্রবাদ আছে –

Early To Bed & Early To Rise,

Make A Man Healthy, Whealthy & Wise!

বোবায় ধরার পেছনে কোনো ভৌতিক ব্যাপার-স্যাপার নেই! সুতরাং ভয় পাওয়ারও কোনো কারণ নেই। স্লিপিং প্যারালাইসিস নিয়ে ভয় না পেয়ে খুব বেশি সমস্যা হলে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

আরও পড়ুন: ফেটিসিজম – মেয়েদের অন্তর্বাস দেখে যৌন অনুভূতি

Facebook Comments
পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন: