হোমিওপ্যাথি ! বিশ্বাস করবেন নাকি করবেন না!

হোমিওপ্যাথি ! বিশ্বাস করবেন নাকি করবেন না!
 

প্রথম কথা যেটা বলতে হয়, কোনো বিজ্ঞানী কোনো খারাপ উদ্দেশ্য নিয়ে কিছু করেন না। তার আবিষ্কার পরবর্তীতে হয়তো আধুনিক আবিষ্কার এর কাছে দুর্বল হয়ে পড়ে। তবে কাউকে ছোট করা বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে এই লেখাটি নয়। লেখাটি হোমিওপ্যাথি বিষয়ে! এর উপর আমরা বিশ্বাস করব কি করব না, তা নিয়ে!

হোমিওপ্যাথি ওষুধ যারা বিক্রি করেন তাদের প্রায় সবারই বক্তব্য তারা জার্মানির ওষুধ ব্যবহার করেন। মূলত সেখানেই হোমিওপ্যাথির আবিষ্কার। কিন্তু হোমিও ওষুধ যে দামে বিক্রি হয় সে দামে এক বোতল ওষুধ দূরে থাক, এক গ্লাস পানিও মিলবে না। তাহলে কি ‘অণুতেই শক্তি’ সূত্র দিয়ে চলছে বছরের পর বছর!

ফার্মেসিতে যে কয়টি ওষুধ বিক্রি হয় তার প্রত্যেকটি ওষুধ এর প্বার্শপ্রতিক্রিয়া আছে। মাত্রাতিরিক্ত খেলেই সমস্যা দেখা দেয় কখনো কখনো কম ডোজেই সাইড অ্যাফেক্ট দেখা দেয়। কিন্তু হোমিওর ক্ষেত্রে এটা কোনোদিনই দেখা যায় না। আসলে কী এই হোমিওপ্যথি এটা জানতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে ১৭৯৬ সালে।  সে সময়ে চিকিৎসা পদ্ধতির অবস্থা আরও ভয়াবহ ছিল। সামুয়েল হানেমান  হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার উদ্ভাবক। তিনি আসলে সেই সময়ের চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন না। তখন বিশ্বাস করা হতো, চার প্রকার তরল (কালো, হলুদ, রক্ত এবং কফ) এর তারতম্যই যত রোগের কারণ। এই অদ্ভুত তথ্য অনুসারে অদ্ভুত সব চিকিৎসা করা হতো।  হ্যানিম্যানের এই অবস্থা ভালো লাগেনি। তিনি ভালো কোনো চিকিৎসা পদ্ধতি বের করতে চেয়েছিলেন। এবং তিনি কাজেও লেগে পড়েন।

হোমিওপ্যাথি শব্দটি এসেছে গ্রীক ‘হোমিওস’ ও ‘প্যাথোস’ শব্দ দুটি থেকে। হোমিওস মানে হলো like বা same। প্যাথোস মানে SUFFERING বা কষ্ট বা রোগের লক্ষণ। অর্থাৎ পুরোটির অর্থ করলে দাঁড়ায় ‘একই রকম রোগ লক্ষণ’।

গবেষণা করতে গিয়ে সামুয়েল হানেমান  সিনকোনা গাছের রস খেয়ে ফেললেন। এতে করে তার কম্প দিয়ে জ্বর এলো। সে এই সিনকোনা আরও অনেককে খাইয়ে দিলেন তাদেরও কম্প দিয়ে জ্বর আসলো। তার মাথার মধ্যে কীভাবে যেন এলো যা রোগ দেয় তা-ই রোগ সারিয়ে তুলে। তিনি এবার সিনকোনা গাছের রস অল্প অল্প করে খাওয়ালেন সবাইকে। এ থেকে তার প্রথম সূত্রের আবিষ্কার- Like cures like – অর্থাৎ যা দ্বারা রোগের সৃষ্টি তা দিয়েই রোগের উপশম। এরপরের সূত্র হচ্ছে সেই বস্তুটিকে পানি বা অ্যালকোহলের সাথে মিশিয়ে লঘু করে খাওয়াতে হবে। ওষুধ যত লঘু, তত তার শক্তি বেশি। শুধু মেশালেই হবে না, ঝাঁকাতেও হবে। যেহেতু পানি মিশিয়ে মিশিয়ে খাওয়াতে হবে সেক্ষেত্রে পানিতে মিশতে মিশতে তো একটা সময় বস্তু প্রায় থাকবেই না! সেক্ষেত্রে উপায়? Water memory নামক এক তত্ত্ব আবিষ্কার করলেন। মানে হলো গিয়ে, পানি তার স্মৃতিতে ধরে রাখে ওষুধের গুণাবলী। এটাকেই বলা হয় অণুতেই শক্তি।

হ্যানিম্যানের ওষুধ লঘুকরণ সূত্রে চলত। কিন্তু কতটা লঘু করা হতো, জানেন? খুব বেশি না এই ধরেন যতটুকু ১০^৩০ ভাগ পানি বা অ্যালকোহলের সাথে ১ ভাগ ওষুধ মেশানো হতো।  ১০^৩০ মানে হলো ১ এর পেছনে ৩০টা শূন্য। কোটি, বিলিয়ন, ট্রিলিয়নের হিসেবও মার খেয়ে যাবে!  বিজ্ঞানী অ্যাভোগ্যাড্রো বলেছিলেন যে ১ মোল পরিমাণ পদার্থে ৬.০২৩ X১০^২৩ টি অণু, পরমাণু বা আয়ন থাকে (এটা রসায়নের মৌলিক একটি সূত্র)। ১ মোল মানে হলো, পদার্থের আণবিক বা পারমাণবিক ভরকে গ্রামে প্রকাশ করা। ১ মোল কার্বন মানে হলো ১২ গ্রাম কার্বন। ১২ গ্রাম কার্বনে ৬.০২৩ X ১০^২৩টি কার্বন অণু থাকে।  এখন দেখা গেলো যে , ১০^৩০ পাওয়ারের হোমিওপ্যাথিক ওষুধে মূল পদার্থের কোনো অণুই অবশিষ্ট থাকে না। দেখলেন তো লঘুকরণের জাদু! হ্যানিম্যানের সূত্রানুসারে, আপনি যত লঘু করবেন তত পাওয়ার বাড়বে। পাওয়ার বাড়তে বাড়তে একদম নির্জলা পানিতে পরিণত হবে। তাতে কী, পানির স্মৃতিতে সঞ্চিত আছে না ওষুধের গুণাবলী! সেই স্মৃতি দিয়েই কাজ চালিয়ে নেয়া যাবে। ২০১৯ সালে সেই সূত্রে শুধু পানি আছে নাকি এর সাথে ওষুধও আছে এটা বলা মুশকিল।

 

বর্তমানে হোমিওপ্যাথি এর গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু?

WHO প্রথম যেটা বলেছে সেইটা কোনোভাবেই ম্যালেরিয়াতে হোমিওট্রিটমেন্ট করা যাবে না।

যুক্তরাজ্যে National Health Service (NHS) ২০১৭ এর জুলাইয়ে এক রিপোর্ট প্রকাশ করে। সেখানে হোমিওপ্যাথিকে অকার্যকর হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়।

হোমিওপ্যাথি ! বিশ্বাস করবেন নাকি করবেন না!
                                                হোমিওপ্যাথি ! বিশ্বাস করবেন নাকি করবেন না!

পুরোটা পড়ুন: এখান থেকে। [1]

The Royal London Hospital for Integrated Medicine ২০১৮ সালের এপ্রিল থেকে National Health Service (NHS) এ হোমিওপ্যাথি ওষুধের গবেষণার জন্যে ফান্ডিং বন্ধ করে দিয়েছে। [2]

আমেরিকার  Federal Trade Commission সাফ বলে দিয়েছে, হোমিওপ্যাথি ঔষধের গায়ে Unscientific লেবেল থাকতে হবে। [3]

তাহলে যে দুই একটা রোগ ভালো হয়ে যায় এটা কিভাবে ?

জ্বর, ঘামাচি, হেঁচকি, গলার কাঁটা, এসব সেরে যায় হোমিওপ্যাথি খেলে। যেগুলোর কিছু কিছু প্লাসিবো, কিছু কিছু শরীরের স্বাভাবিক রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতায় সারে, আর কিছু কিছু স্টেরয়েড দিয়ে তাৎক্ষণিক উপশম দেয়া হয়!

তথ্যসূত্র:

  1. NHS 
  2. BBC NEWS
  3. SLATE
  4. উইকিপিডিয়া
  5. বিজ্ঞানযাত্রা 
Facebook Comments
পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন: