সায়েন্স ফিকশন : ইটি

সায়েন্স ফিকশন : ইটি
 

ইটি

ঘুম থেকে উঠেই বিরক্ত চোখে চারদিকে তাকালো জিবান। এই নিয়ে তৃতীয় বারের মতো তার ঘুম ভাঙলো। মাঝরাতে কখনো ঘুম ভাঙে না জিবানের। পৃথিবী থেকে  মহাকাশযান নিয়ে বেরিয়েছে অনেকদিন হয়েছে। এর মধ্যে কখনো এমন হয়নি। যদিও মহাকাশে রাতদিন বলে কোনো ব্যাপার নেই। তবু আলোর সাহায্যে এমনভাবে সিস্টেমটা করা হয়েছে যাতে রাতদিনের তফাত মনেহয়। ঘর থেকে বেরোলে সরু একটা গলির মতো, হাঁটা-চলার জন্য। এপাশে অনেকগুলো ঘর,  মহাকাশযানের সবার থাকার ব্যবস্থা এখানে। ওপাশে দেয়াল। টাইটেনিয়াম ও ক্রোমিয়ামের সংকর ধাতু দিয়ে তৈরী দেয়ালের উপর তাপ অপরিবাহী আস্তরণ। ফাঁকে ফাঁকে স্বচ্ছ প্লেক্সি গ্লাসের জানালা। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো জিবান। চারিদিকে শুধু অন্ধকার আর অন্ধকার। হেঁটে কন্ট্রোলরুমের দিকে যেতে লাগলো সে। তার পিছু পিছু ইটি ও আসছে। কোনো এক অজানা কারণে রোবট ভালো লাগে না জিবানের। ইটি পাশাপাশি হেঁটে যেতে যেতে বলল,

– পৃথিবীর কথা মনে করে নিশ্চই তোমার ঘুম আসছে না?

– তুমি বেশি বেশি চিন্তা না করে একটু চুপ থাকো।

– ও আচ্ছা, বুঝতে পেরেছি। দুটো ব্লাকহোলের মধ্য দিয়ে হাইপারডাইভ দিতে হবে, সেই টেনশনে তুমি ঘুমাচ্ছো না।  তুমি তো জানোই, এটা তৃতীয় মাত্রার মহাকাশযান। আগের মহাকাশযানগুলোর থেকে অনেক বেশি উন্নত। এত ভয় পাচ্ছো কেন?

– তুমি কি ভুলে গেছো, আমি এই মহাকাশযানের দলপতি? এটার খুঁটিনাটি প্রায় সবকিছু আমার জানা আছে। আমাকে বিরক্ত কোরো না।

– তুমি আমাকে অপছন্দ করো কেন?  আমার বুদ্ধিমত্তা তোমাদের চেয়ে কম নয়।

– আমি তোমাকে অপছন্দ করি না, তুমি যাও।

– এখন তুমি নিশ্চয় সিডিসির সাথে দাবা খেলতে যাচ্ছো।

– হ্যাঁ, তাতে তোমার কোনো সমস্যা?

– না, যাও।

ইটি চলে গেল। কন্ট্রোলরুমে যেতেই সিডিসির যান্ত্রিক গলা শুনতে পেল জিবান।

‘মহামান্য জিবান, আপনি তো মাঝরাতে কখনো জেগে থাকেন না। আপনার কোনো সমস্যা হয়েছে?’

সিডিসি আরও কিছু বলার আগেই জিবান সুইচ টিপে তার কথা বন্ধ করে দিয়ে দাবা খেলতে বসলো। সিডিসির সাথে দাবা খেলায় কেউ জিততে পারে না। সিডিসি কখনো ভুল চাল দেয় না। হঠাৎ সিডিসি বিপ বিপ আওয়াজ করতেই জিবান সুইচ অন করে দিলো। সিডিসি তার যান্ত্রিক আওয়াজে বলতে লাগলো, ‘আমাকে কথা বলার সুযোগ করে দেয়ার জন্য ধন্যবাদ, মহামান্য জিবান। আপনাদের জন্য জরুরি সংবাদ আছে। মহামান্য জিবান, আর মাত্র বিলিয়ন কিলোমিটার দূরেই মিউন নক্ষত্র।’

সিডিসির কথা শুনে জিবান চমকে ওঠে। মিউন নক্ষত্রের পরেই অনেক কাছাকাছি  দুটো ব্ল্যাকহোল। এখান দিয়ে যাওয়ার জন্য এর আগের মিশনগুলোতে অনেক পরিকল্পনা করা হয়েছে কিন্তু কোনোভাবেই কোনো ব্যবস্থা করা যায়নি। এর আগে এই মিশনে যে তিনটি মহাকাশযান পাঠানো হয়েছে, সেগুলোর ধ্বংসাবশেষও পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হয় সেগুলো ব্ল্যাকহোলের মধ্যে পড়ে গেছে, নয়তো হাইপারডাইভ দিতে গিয়ে সময়ের গড়মিল হয়ে হারিয়ে গেছে। হাইপারডাইভের ব্যাপারটা এখনো পুরোপুরি মানুষের আয়ত্ত্বে আসেনি। প্রতিবার সব ঠিকঠাক মতো করা হয়, তবুও কোথায় যেন একটা গোলমাল হয়ে যায়। হাইপারডাইভ দিতে গিয়ে যেসব মহাকাশযান হারিয়ে যায়, মহাকাশ গবেষণাকেন্দ্র কখনোই সেগুলোর কোনো খবর পায় না। সেগুলো কোথায় যায়, কেউ জানে না। জিবান কিছুক্ষন চুপ থেকে সিডিসিকে বলল, ‘সবার ঘুম ভাঙাও, জরুরি সবাইকে কন্ট্রোলরুমে আসতে বলো।’ সিডিসি জবাব দিলো, ‘সবাইকে জানানো হয়েছে, কিছুক্ষণের মধ্যেই সবাই চলে আসবে।’

মনিটরের দিকে তাকিয়ে স্রুরা বলল, ‘আমার মনে হয় হাইপারডাইভ দিয়ে ৫০ হাজার আলোকবর্ষের দূরত্ব অতিক্রম করাটাই ভালো হবে। এতে মিল্কিওয়ের সীমানা পেরিয়ে আমরা ‘হালো’তে গিয়ে পৌঁছাবো।’  স্রুরার কথা শুনে ইলিনা তার দিকে তাকালো। ইলিনা এই মহাকাশযানের দুইজন জীববিজ্ঞানীর একজন। সাতাশ বছর বয়েসি হাসিখুশি মেয়ে। কিন্তু সিরিয়াস আলোচনায় সে কোনো কথা বলতে পারে না। স্বভাব মতো কিছু বলতে গিয়ে সে চুপ করে রইলো। ‘আমার মনে হয়, দূরত্বটা আরও কিছুটা কমানো উচিত। গ্যালাক্সির এক পাশ থেকে অন্য পাশের দূরত্ব ৮০ হাজার আলোকবর্ষ। গ্যালাক্সিতে আমাদের সৌরমণ্ডল এর অবস্থা যেখানে সেখান থেকে গ্যালাক্সির সীমানার বাইরে পৌঁছানোই আমাদের লক্ষ্য।’ তিহানের কথা শুনে সবাই তার দিকে তাকালো। হাইপারডাইভের প্রায় পুরো ব্যাপারটা তার উপর। সে সাধারণত তেমন কথা বলে না। গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে তার কথাকে সবাই কিছুটা গুরুত্বের সঙ্গেই নেয়। কিন্তু অজানা কোনো কারণে স্রুরা, তিহানকে পছন্দ করে না। স্রুরা, তিহানের কথাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে বলল, ‘আমরা জানি না এই ব্ল্যাকহোলগুলো পার হতে পারব কিনা। এর আগে কেউ এর ওপাশে যায়নি। যদি আমরা এই দূরত্বটুকু অতিক্রম করতে পারি তাহলে প্রথমবারের মতো মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি পার হবার জন্য ইতিহাসে আমাদের নাম উঠবে। রিস্ক না নেয়াই ভালো। কে জানে, শেষ সীমানাতে ব্লাকহোলের আড্ডাখানা আছে নাকি। দু’টো ব্ল্যাকহোল পার হতেই পারছি না।’

একথা বলেই সে হা হা করে  হাসতে লাগল। তিহানের বলতে ইচ্ছে করল, ‘হালোতে যে ব্ল্যাকহোলের আড্ডাখানা নেই, সেটা স্রুরা কীভাবে জানলো?’ কিন্তু সে কিছু না বলে চুপচাপ বসে রইল। জিবান যা বলবে সে তাই করবে। ‘তুমি কোনো কথা বলছো না কেন ক্রিস্টি?’ জীববিজ্ঞানী ক্রিস্টির দিকে তাকিয়ে কথাটা বললো জিবান। মনিটরের দিকে তাকিয়ে থেকে ক্রিস্টি বলল, ‘হাইপারডাইভের ব্যাপারটা স্রুরাই ভালো জানে। তাছাড়া আমার মনে হয় সীমানা অতিক্রম করার সময়ে আনন্দটা উপভোগ করা উচিত। তুমি দলপতি। তুমি যা সিদ্ধান্ত নেবে তাই সবাই মানবে।’

ক্রিস্টি আর ইলিনার আপাতত কোনো কাজ নেই, তারা চুপচাপ বসে রইলো। দলের ইঞ্জিনিয়ার তিহান হাইপারডাইভের সমস্ত ব্যবস্থা ঠিকঠাক করার জন্য চলে গেল। ঠিক কী কারণ জানা নেই, জিবানের মনটা হঠাৎ খারাপ হয়ে গেল। স্বচ্ছ জানালা দিয়ে সে বাইরে তাকিয়ে রইলো। তার জীবনের অনেকাংশ কেটেছে মহাকাশে। তারা যদি আজ ঠিকমতো হাইপারডাইভ দিতে পারে, ইতিহাসে তাদের নাম উঠবে। কিন্তু যদি না পারে? যদি আগের মিশনগুলোর মতো হারিয়ে যায় তারা? পৃথিবী ছেড়ে এসেছে অনেক আগে। পৃথিবী এখন বাসের অযোগ্য প্রায়,  নানান গ্রহে ছড়িয়ে পড়েছে মানুষ। তবুও হঠাৎ পৃথিবীর কথা জিবানের মনে পড়ে যায়।

কন্ট্রোলরুমে সবাই যে যার সিটে বসে ভালোভাবে নিজেদের আটকে নিয়েছে। সিডিসি সব ব্যাপার সামলে নেয়, তবুও তিহান শেষবারের মতো সব দেখে নিলো। কাউন্টডাউন শুরু হলো। দাঁতে দাঁত চেপে সবাই অপেক্ষা করতে লাগলো।  আস্তে আস্তে মহাকাশযানের গতি বাড়ছে। ইটি সবার সাথেই দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে ইনজেকশন। কিন্তু কেউ অচেতন হতে চাচ্ছে না, সবাই যতক্ষণ সম্ভব শেষটুকু দেখতে চাচ্ছে। বেগ বাড়ছে, চারপাশের দৃশ্য দ্রুত পালটে যাচ্ছে। হঠাৎ করে মনে হলো মহাকাশযানটা একটা ধাক্কা খেয়ে ভয়ংকরভাবে দুলে উঠল। জিবান চেষ্টা করল চোখ খোলা রাখতে, কিন্তু পারল না। আস্তে আস্তে চোখের সামনে সব অন্ধকার হয়ে যেতে লাগলো।

জিবানের যখন জ্ঞান ফিরল তখন মহাকাশযানে নিভু নিভু আলো। ইটি মনিটরের দিকে তাকিয়ে আছে। ‘অভিনন্দন মহামান্য জিবান। হাইপারডাইভ সফল হয়েছে। মহাকাশযানটি এখন আছে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির সীমানার কাছাকাছি। আর মাত্র কয়েকদিন পরেই আমরা প্রথমবারের মতো গ্যালাক্সির বাইরে যাব।’ সিডিসির যান্ত্রিক গলা কিংবা ইটির সবুজ চোখের চাউনি কোনোটাই জিবানের কাছে বিরক্তিকর লাগলো না। একটা অন্যরকম ভালোলাগা নিয়ে সে চেয়ার থেকে নেমে জানালার ওপাশে দেখতে লাগলো।

আস্তে আস্তে সবার জ্ঞান ফিরছে। সবার মধ্যে একটা অন্যরকম অনুভূতি। কন্ট্রোলরুমের টেবিলে বসে সবাই ডিটানোন মিশ্রিত পানীয় খেতে খেতে গল্প করছে। এখন কী করা যায় সেগুলো নিয়েই আলাপ আলোচনা হচ্ছে। ঠিক এমন সময় সিডিসির বিপ বিপ আওয়াজ শোনা গেল। সুইচ অন করে দিতেই সিডিসি তার যান্ত্রিক গলায় বলল, ‘আমাদের থেকে ৩হাজার মাইল দূরে একটি গ্রহের সন্ধান পাওয়া গেছে, যার থেকে রেডিওঅ্যাকটিভ সিগন্যাল পাওয়া যাচ্ছে। যার মানে সেখানে বুদ্ধিমান কোনো প্রাণি থাকার সম্ভাবনা আছে।’ জিবান সবার দিকে তাকালো। সবাই জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে আছে। ইটি বলল, ‘তোমরা চাইলে তাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারো। নতুন ধরনের কোনো বুদ্ধিমান প্রাণি হতে পারে।’ ক্রিস্টি ইটির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘যদি বুদ্ধিমত্তার স্কেলে তারা ৮ এর উপরে হয়? কী দরকার রিস্ক নেয়ার, আমরা আমাদের মিশন শেষ করি। ঝামেলা না করে কাজ শেষ করে ফিরে যাওয়াই ভালো হবে।’

স্রুরা নিজের কম্পিউটারের সামনে বসে বলল, ‘আমরা নাহয় গ্রহে না নামলাম। যোগাযোগ তো করা যেতেই পারে। তাছাড়া মহাকাশকেন্দ্রের নিয়মানুসারে কোনো নতুন গ্রহের সন্ধান পেলে যোগাযোগ করার জন্য বলা আছে। বিপদজনক না হলে সেই গ্রহে নামার কথাও বলা আছে।’

তিহান স্রুরার কথায় বাধা দিয়ে বলল, ‘তুমি ভুলে যাচ্ছো যে এটা কোনো অনুসন্ধানী মহাকাশযান নয়। আমরা গ্রহের খোঁজে বেরোইনি। আমরা একটা মিশনে আছি। এখানে কোনো বিপদ হলে মহাকাশকেন্দ্র থেকে সাহায্য আসবে না।’

জিবান পুরো আলোচনাটা থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘আমরা গ্রহটার ব্যাপারে খোঁজখবর নেবো, কোনো প্রাণি থাকলে যোগাযোগ করার চেষ্টা করব। সবাই যার যার দায়িত্ব নেয়ার জন্য প্রস্তুত হও। সিডিসি, গ্রহটার আশেপাশের কোনো পালসারকে কেন্দ্র করে একটা কক্ষপথ বানাও। স্রুরা তাদের সাথে যোগাযোগের সিগন্যাল, ভাষা সব ঠিক করে নাও। ক্রিস্টি আর ইলিনা, তোমরাও প্রস্তুত হয়ে থাকো।’

তিহান মনিটরের দিকে তাকিয়ে আছে। ইটিকে সাথে নিয়ে মহাকাশযানটিকে গ্রহের কাছাকাছি একটি পালসারকে কেন্দ্র করে নির্দিষ্ট কক্ষপথে বিচরণ করতে দিয়ে জিবানকে বলল,

– কক্ষপথ দুই হাজার মাইলের একটু বেশি হয়ে গেছে।

– সমস্যা নেই।

স্রুরার দিকে তাকিয়ে জিবান বলল, ‘তোমার কোনো সিগন্যাল ফেরত এসেছে?’ স্রুরা বলল, ‘এখনো আসেনি। বুঝতে পারছি না, রেডিওঅ্যাকটিভ সিগন্যালটা তাহলে কীভাবে আসছে!’

তিহান মনিটরের সামনে বসে থেকে গ্রহটির সম্পর্কে সব কিছু জেনে নিচ্ছে। সিডিসি মুহূর্তেই প্রায় সব খবর বের করতে পারে। গ্রহটির বাতাসে মিথেন আর হাইড্রোজেন। সামান্য পরিমাণেও অক্সিজেন নেই। অক্সিজেন শূন্য একটি গ্রহে প্রাণের বিকাশ হবার কোনো সম্ভাবনা নেই। বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইড নেই। কোনো উদ্ভিদ থাকার সম্ভাবনাও নেই একেবারে। কার্বন কিংবা সিলিকন ভিত্তিক কোনো প্রাণের বিকাশ হয়নি। হালকা বেগুনি আর কালচে লাল রঙের গ্রহটার দিকে তাকিয়ে জিবান সিদ্ধান্ত নিলো একটা স্কাউটশিপ পাঠিয়ে কিছু মাটি তুলে আনা হবে। কিছু রুটিনবাঁধা কাজ শেষ করে এই গ্রহটি ছেড়ে চলে যাবে।

স্কাউটশিপের মসৃণ দেয়ালট অ্যালুমিনিয়াম, ক্যাডমিয়াম আর সিলঝিয়ামের সংকর ধাতুর তৈরি। বায়ুমণ্ডল ভেদ করে এটি ধীরে ধীরে গ্রহটিতে নামবে। কিছু মাটি তুলে নিয়ে আবার ফেরত আসবে। সবকিছু ঠিকঠাক, তখন ইলিনা হঠাৎ বলল, ‘আমি এই গ্রহটাতে নামতে চাই!’ জিবান বলল, ‘সেটার কোনো দরকার নেই। এখানেই পরীক্ষা করে সব জানা যাবে!’ ইলিনা কিছু বলতে গিয়েও চুপ করে রইলো। তিহান সেটা খেয়াল করে বলল, ‘তুমি ক্লিয়ার করে বলো, কেন নামতে চাইছো?’ ইলিনা একটু ইতস্তত করে বলল, ‘আসলে আমি কখনো পৃথিবী ছাড়া অন্য কোনো গ্রহে নামিনি। আমার খুব ইচ্ছে করছে এই গ্রহটাতে নামতে। তাছাড়া এটা তো মৃত গ্রহ, এখানে নামলে তো কোনো বিপদ নেই।’ ইলিনার শিশুসুলভ আবদার শুনে জিবান অনেক কষ্টে হাসি চেপে বলল, ‘আচ্ছা, ঠিক আছে। আমরা এখানে নামব। তারপর দৌড়াদৌড়ি করব, লাফালাফি করব। এই গ্রহের মাধ্যাকর্ষণ শক্তি ততটা জোড়ালো নয়, তাই এখানে খুব সহজেই লাফানো যাবে। কী বলো সবাই?’ হাইপারডাইভ সফলভাবে শেষ করে সবার মন প্রফুল্ল ছিল। ডিটানোন মিশ্রিত উত্তেজক পানীয় পান করতে করতে সবাই রাজী হয়ে গেল গ্রহটাতে নামতে।

সায়েন্স ফিকশন _ ইটি

 

প্রথমে টাইটেনিয়ামের দরজা, তারপর সিলঝিনিয়ামের দরজা, তারপর স্বচ্ছ প্লেক্সি গ্লাসের দরজা ধীরে ধীরে খুলে গেল। সবাই স্কাউটশিপে গিয়ে বসলো।স্কাউটশিপটা ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে গ্রহটার দিকে। বায়ুমণ্ডল খুব হালকা। বেগুনী রঙের ধোঁয়া চারপাশে। গ্রহটাতে থামার আগে স্কাউটশিপটা একটা ঝাঁকুনি খেলো। সবার প্রথমে ইলিনা নামলো। ভেজা বালুর মতো মাটিতে প্রায় লাফিয়ে লাফিয়ে সে চলতে লাগলো। ইলিনার পর গ্রহে নেমে তিহান ইলিনার পাশে হাঁটছে। আস্তে আস্তে সবাই নেমে এলো। ইটি নামামাত্র খানিকটা দেবে গেল। সবাই সেটা দেখে হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছে। ইটি কোনোমতে স্কাউটশিপে ফিরে গেল। জিবান স্কাউটশিপেই ছিল। জিবানকে বসে থাকতে দেখে ইটি বলল, ‘গ্রহটাকে আমার অশুভ মনে হচ্ছে।’ ইটির কথায় জিবান একটু বিরক্ত হয়ে বলল, ‘তুমি রোবট, অশুভ কথাটা তোমার ক্ষেত্রে মানায় না। তুমি কেন সবসময় মানুষের মতো ভাবতে চাও?’

ঠিক এমন সময় তিহানের চিৎকার শোনা গেল। সবাইকে ডাকছে তিহান। জিবান হাতে একটা অস্ত্র নিয়ে স্কাউটশিপ থেকে নিচে নেমে এলো। এমনিই এটা নিয়ে এসেছিল সে। একটা আতঙ্ক নিয়ে এগিয়ে গিয়ে দেখল সবাই মিলে ইলিনাকে ধরে রেখেছে। মনে হচ্ছে অদৃশ্য কিছু তাকে টেনে নিতে চাচ্ছে। জিবান নিজের হাতের অস্ত্রটা ঠিকমতো ধরে ট্রিগার টেনে ধরল। একটু পরেই প্রচণ্ড বিস্ফোরণ হলো। ইলিনা ছিটকে পড়ে অজ্ঞান হয়ে গেল। সবার চোখে আতঙ্ক। দূরে কোথাও হালকা নীল আলো জ্বলে উঠে নিভে গেল। তিহান সেদিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমাদের এখান থেকে দ্রুত চলে যাওয়া উচিত।’ জিবান কিছু বলল না। ক্রিস্টি ইলিনার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল। সবাই ইলিনার দিকে তাকিয়ে দেখল ইলিনার হাতে যেখানে অদৃশ্য কোনো কিছু ধরেছিল সেখানটা গলে গেছে। স্পেসস্যুট গলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরই ইলিনা মারা গেল। ঘটনার আকস্মিকতায় সবাই ভেঙে পড়ল। কেউ এক পা নড়তে পারছে না। কোনো এক অদৃশ্য ভয়, অজানা আতঙ্কে ঘিরে রইলো সবাই।

হালকা নীল রঙের আলোটা আবারও দেখা গেল। এবার মনে হলো সামনে থেকে অনেকগুলো ছড়িয়ে থাকা নীল আলোর বিন্দু এগিয়ে আসছে। তাদের বরাবর কিছুদূর এসে থেমে গেল। জিবান তার হাতে ধরে রাখা অস্ত্রটা ভালোভাবে ধরে রেখে বলল, ‘সবাই আমার সাথে থাকবে। মনে হচ্ছে মহাজাগতিক কোনো প্রাণির কবলে পড়েছি আমরা।’ তারপর ক্রিস্টির দিকে তাকিয়ে বলল,

– ক্রিস্টি, তুমি কি কিছু বুঝতে পারছো?

– আমার মনে হচ্ছে এদের দেহের ঘনত্ব এত কম যে আমরা তাদের দেখতে পাচ্ছি না। কিংবা অন্ধকারে ঠিকভাবে বুঝতে পারছি না। তাদের শরীরে নীল এক বিন্দু আলো কিছুক্ষন পরপর জ্বলছে, নিভছে। যার থেকে তাদের উপস্থিতিটা বোঝা যাচ্ছে।

ঠিক এমন সময় একটা আওয়াজ ভেসে এলো। অদ্ভুত একটা কণ্ঠে কেউ কিছু বলছে মনে হলো। কিন্তু তারা কেউ কিছু বুঝতে পারল না। তিহান চুপ করে ছিল। সে হঠাৎ বলল, ‘নীল আলো এগিয়ে আসছে। আমাদের উচিত স্কাউটশিপে যাওয়া।

জিবান ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে। তার হাতে অস্ত্র, নীল আলোর অদৃশ্য প্রাণি এগিয়ে আসলে এটা চালাতে একটুও দ্বিধা করবে না সে। তখন আবার সেই অদৃশ্য কণ্ঠ শোনা গেল। স্রুরা হাঁটতে হাঁটতে খুব মনোযোগ দিয়ে শব্দটা শুনছিল। ভাষা তৈরী করা তার কাজ। এক মুহূর্ত চিন্তা করেই সে চমকে উঠল। গত কয়েকদিন ধরে সে নতুন একটা ভাষা বানানোর চিন্তাভাবনা করছিল। হাইপারপডাইভের টেনশনে আর বানানো হয়নি। সে তার কম্পিউটারেও তুলে রাখেনি কিছু। কিন্তু এখন সেই ভাষাটাই ভেসে আসছে সুরে সুরে। স্রুরা আবার মনোযোগ দিয়ে শুনল। আর পর মুহূর্তেই সেটার অর্থ ধরতে পারল।

“তোমরা যেতে পারবে না” স্রুরার মুখে এই কথাটা শুনে সবাই চমকে উঠে হাঁটা থামিয়ে দিলো। অবাক হয়ে সবাই তাকিয়ে আছে স্রুরার দিকে। তিহান জিজ্ঞেস করলো, ‘কী বলছো তুমি?’ স্রুরা তিহানের কথাটা শুনল বলে মনে হলো না। সে নিজের মনে বলতে থাকল, ‘তোমরা শুধু সেখানেই যাবে, যেখানে আমরা নিয়ে যাব।’  স্রুরার কথার মাথামুণ্ডু কেউ কিছু বুঝতে পারল না। তাকে দেখে মনে হচ্ছে তার নিজের ওপর কন্ট্রোল নেই। বিড়বিড় করে কথা বলতে বলতে স্রুরা অন্যমনস্কভাবে অন্যদিকে হাঁটতে থাকে। তিহান তাকে জড়িয়ে ধরতেই ঝটকা দিয়ে তাকে সরিয়ে দেয় স্রুরা। তারপর আবার বলতে থাকে, “তোমরা সবাই আমাকে অনুসরণ করবে।” সবাই একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইলো। সবাই বুঝতে পারছে, ভয়ংকর এক বিপদের সম্মুখীন হতে যাচ্ছে সবাই। স্রুরা তখনো বিড়বিড় করে বলে যাচ্ছে “তোমরা সবাই আমাকে অনুসরণ করবে।”  কেউ কিছু বোঝার আগেই সবাই অন্যমনস্কভাবে হেঁটে স্রুরাকে অনুসরণ করতে লাগলো।

জ্ঞান ফিরতেই জিবান দেখলো সে কোথাও পড়ে আছে। জায়গাটা প্রথম দেখায় কিছুটা অদ্ভুদ মনে হলো জিবানের। উঠে দাঁড়াতে গিয়ে পড়ে গেল। জায়গাটা পিচ্ছিল। চারপাশের দেয়াল মনে হলো নড়ছে। অবিশ্বাস্য ব্যাপার। অন্ধকারে তেমন ভাবে আশেপাশের কিছু বোঝা যাচ্ছে না। অন্ধকার চোখে কিছুটা সয়ে আসতেই জিবান দেখলো আশেপাশে সবাই অজ্ঞান হয়ে আছে কিংবা মারা গেছে। তিহানের জ্ঞান ফিরতেই জিবান কোনো মতে তার কাছে গিয়ে পৌঁছাল। তারপর একে একে সবার জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করতে লাগলো। কেউ বুঝতে পারছে না তারা আসলে কোথায় আছে। সবার জ্ঞান ফিরতেই সেই অদ্ভুত আওয়াজটা আবার শুনতে পেল তারা। আশেপাশে অনেকগুলো নীল আলো জ্বলছে নিভছে। তারমধ্যে ক্রিস্টি হঠাৎ চেঁচিয়ে বলল, ‘আমরা প্রাণিটার পেটের মধ্যে আছি!’ ক্রিস্টির কথা শুনে সবাই চমকে তার দিকে তাকালো। ক্রিস্টির কথা শুনে জিবান বলল, ‘আমার কিন্তু তা মনে হয় না। আমার মনে হয় আমাদের আটকে রেখেছে। তারা আসলে কী করতে চাচ্ছে আমি সেটাই বুঝতে পারছি না। মেরে ফেলার হলে এতক্ষণে মেরে ফেলতে পারত।

তখন আবার সেই অদৃশ্য কণ্ঠটা শোনা গেল। স্রুরা সেটা শুনে বলল,’আমরা তোমাদের বুঝতে চাচ্ছি, তোমরা সমঝোতা করলে আমরা তোমাদের কোনো ক্ষতি করব না!” স্রুরার কথা শুনে সবাই তার দিকে তাকাতেই স্রুরা বলল, ‘প্রাণিটা সেই ভাষায় কথা বলছে যেটা শুধুমাত্র আমার মস্তিষ্কে আছে। এটা আমার বানানো ভাষা। এইজন্য আমি অর্থ করতে পারছি।’  স্রুরা চেঁচিয়ে প্রাণীটার উদ্দেশ্যে বলল, ‘তুমি সরাসরি বাংলায় কেন আমাদের সাথে কথা বলছো না?’ আশ্চর্যজনকভাবে তখন বাংলায় কথা ভেসে এলো। প্রাণিটা বলছে, ‘আমরা তোমাদের বুঝতে চাই। তোমাদের প্রতিটা কোষ, প্রতিটা নিউরন আমরা বুঝতে চাই।’ এরপর আর কোনো কথা শোনা গেল না। সবাই বুঝতে পারল, এখানে তাদের ব্যবহার করা হবে গিনিপিগের মতো। কেটেকুটে কিংবা গলিয়ে দেখা হবে তাদের ভেতরটা। ভাবতে ভাবতেই সবাই অজ্ঞান হয়ে গেল।

অনেকক্ষণ হলো ইটি স্কাউটশিপে বসে আছে। সিডিসির কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য প্রেরণ করে গ্রহটার সম্পর্কে যত জানা যায় ততই জানার চেষ্টা করছে। কিছু মাটি তুলে এনে পরীক্ষা করছে দক্ষ জীববিজ্ঞানীর মতো। রোবটদের এই এক সুবিধা, ইচ্ছে করলেই হয়ে যেতে পারে ডাক্তার কিংবা বিজ্ঞানী। মহাকাশবিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী প্রথমত, কোনো গ্রহে নেমে নিরাপত্তার জন্য কেউ বেশি দূর যেতে পারবে না। দ্বিতীয়ত, খুব বেশি সময় গ্রহে ঘুরতে পারবে না। অনেকক্ষণ পার হবার পরও যখন কেউ ফিরে এলো না তখন ইটি একটা জেট প্যাক নিয়ে বেরিয়ে পড়ল সবাইকে খুঁজে বের করার উদ্দেশ্যে।

জ্ঞান ফেরার পর তিহান দেখল তারা একটা খোলা জায়গায় পড়ে আছে। এই জায়গাটা পিচ্ছিল নয়। তাদের চারপাশ ঘিরে নীল নীল আলো। প্রাণিগুলো অ্যামিবার মতো আকারহীন স্বচ্ছ, তাই ঠিকমতো আকার বোঝা যায় না। ক্রমাগত এরা দেহের গঠন পালটাচ্ছে। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো অ্যামিবার মতো এরা মাটির সাথে মিশে নয় যখন যেরকম দরকার সেভাবে থাকতে পারছে। মানুষের মতো দাঁড়িয়ে কিংবা মাটির সাথে মিশে। তিহান, ক্রিস্টির দিকে তাকিয়ে ইশারায় সামনে থাকা একটা গর্ত দেখাল। গর্তে কোনো একধরনের তরল আছে। এই গ্রহের অনেক জায়গাতেই এমন তরল রয়েছে। প্রাণিগুলো খুব সাবধানে এই তরলের পাশ কেটে ঘোরাফেরা করছে। তরলটা থেকে ধোঁয়া উঠছে। জিবানও ব্যাপারটা খেয়াল করল। একটু মনযোগ দিয়ে প্রাণিগুলোকে দেখেই সে বুঝতে পারল এই তরলটা এদের জন্য ক্ষতিকর। মুহূর্তেই তার মাথায় একটা বুদ্ধি এলো। যদিও এতে তার মৃত্যুর সম্ভাবনা আছে।

কয়েকটা প্রাণি তিহানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই প্রাণিগুলো তিহানকে ধরে অন্য কোথাও নিয়ে যেতে লাগলো। জিবান খেয়াল করল তিহান অজ্ঞান হয়ে গেছে। তিহানের স্পেসস্যুট কিছুটা গলতে শুরু করেছে। আর কিছুক্ষন গেলেই স্পেসস্যুটটা গলে তিহান মারা যাবে। কোনোকিছু না ভেবে, এক মুহূর্ত দেরি না করে জিবান প্রাণিগুলোর কাছে গেল। তিহানের পা ধরে টান দিতেই তিহান মাটিতে পড়ে গেল। সবাই দৌড়ে গিয়ে তিহানকে ধরল। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই জিবান দুইহাত দুইদিকে প্রসারিত করে গর্তের দিকে যেতে লাগলো। তার গায়ের সাথে লেগে আছে কতগুলো নীল আলোর বিন্দু। জিবানের স্পেসস্যুট গলতে লাগলো।

মাটিতে হাঁটতে পারছে না তাই ইটি জেটপ্যাক নিয়ে ওদেরকে খুঁজতে বেরিয়েছে। এমন সময় ইটি দেখল, জিবান ওই গর্তগুলোতে ঝাঁপ দিতে যাচ্ছে। ইটি জেটপ্যাক নিয়ে দ্রুত জিবানের কাছে পৌঁছাল। গর্তে ঝাঁপিয়ে পড়ার মুহূর্তে জিবানকে ধরে ফেলায় প্রাণিগুলো গর্তে পড়ে গেল। জিবানের স্পেসস্যুট ততক্ষণে অনেকাংশ গলে গেছে। ইটিকে দেখে যেন জিবান বলল, ‘জলদি আমাকে আর তিহানকে স্কাউটশিপে নিয়ে যাও।’ দুজনকে নিয়ে ইটি স্কাউটশিপে যাচ্ছে। ইটি চলে যেতেই সবাই গর্তের দিকে তাকালো। নীল আলো দেখা যাচ্ছে না। কেউ বুঝতে পারছে না কী হচ্ছে! অদৃশ্য আওয়াজটা আবার শোনা গেলো। “তোমরা আমাদের কথা শুনবে!” এই কথার মানে কেউ বুঝতে পারল না। বোঝার চেষ্টাও করতে পারল না। তার আগেই ক্রিস্টি আর স্রুরা অজ্ঞান হয়ে যেতে লাগলো।

জিবান আর তিহানকে স্কাউটশিপে রেখে ইটি যখন ফিরে এলো তখন দেখল ক্রিস্টি অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে আছে। মাটিতে স্পেসস্যুটের গলিত অংশ। স্রুরার দেহের অনেকাংশ গলে গেছে। নীল নীল কিছু আলোর বিন্দু  চারপাশ ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। দেখে মনে হয় তারা আসলে বোঝার চেষ্টা করছে মানুষ কী রকম হয়! রোবট বলেই হয়তো এই ভয়ংকর দৃশ্য দেখে ইটি ঘাবড়াল না।  ইটি তার সবুজ চোখের আলো বাড়িয়ে নিয়ে দেখলো সাতটা প্রাণি ক্রিস্টিকে ঘিরে রেখেছে। একজন মানুষের অনেকগুলো ক্লোন যেমন হয় এরা অনেকটা সেরকম। যার মানে এরা একই রকম চিন্তা করে। সবাই মিলিত ভাবে প্রচণ্ড শক্তিশালী প্রাণি। ইটিকে দেখে সবগুলো প্রাণি একসাথে ইটির দিকে এগিয়ে এলো। ইটি আস্তে আস্তে গর্তের পাশে গেল। প্রাণিগুলো ইটির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কৌতুহল তাদের এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে মৃত্যুর দিকে। ইটি জেটপ্যাক ঘুরিয়ে এনে প্রাণিগুলোকে তার সাথে আটকালো। জেটপ্যাক ছেড়ে নিচে পড়ার মুহূর্তে মাথার পেছন থেকে মেমোরি মডিউলটা বের করে মাটিতে ফেলে, ইটি পড়ল বিষাক্ত তরলে।

ক্রিস্টির জ্ঞান ফিরেছে। স্রুরার দেহের দিকে তাকিয়ে ভয়ে সে চিৎকার করে উঠল। চারপাশে আর কাউকে দেখতে পেল না। তবে কি সবাই মারা গেছে? একটু সামনে এগোতেই দেখল জেটপ্যাকটা ভেসে ভেসে যাচ্ছে। গর্তের কাছে যেতেই দেখল মাটির উপর কালো কী যেন পড়ে আছে! হাতে নিয়ে বুঝতে পারল ইটির মেমোরি মডিউল। সেটা হাতে নিয়ে ক্রিস্টি হাঁটতে থাকল। ক্লান্তিতে, ভয়ে তার দু পা অবশ হয়ে আছে। সবার মতো যদি সেও মরে যেত সেটাও হয়তো খুব খারাপ হতো না। স্কাউটশিপের ভেতরে যেতেই দেখল তিহান আর জিবান বসে আছে। দুজনকে দেখে ক্রিস্টি অবাক হয়ে গেল। পরক্ষণেই কাঁদতে লাগলো সে। হাতে ইটির মেমোরিটা নিয়ে চুপচাপ বসে রইলো ক্রিস্টি। গ্রহটাকে পেছনে ফেলে স্কাউটশিপটা এগিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।

মহাকাশযানে গিয়েও সবাই চুপচাপ বসে রইলো। তাদের মিশন সফল হবে। প্রথমবারের মতো মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির বাইরে যাওয়ার জন্য ইতিহাসে তাদের নাম উঠবে, তবুও কোনো অনুভূতি কাজ করছে না কারও। নিস্তব্ধ মহাকাশযানটা এগিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। কয়েকদিন পর পার হয়ে যাবে শেষ সীমানা।

[ সমাপ্ত ]

লিখেছেন: তাসনিম ইসলাম

Facebook Comments
পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন: