শল্য চিকিৎসার ইতিহাস

শল্য চিকিৎসার ইতিহাস
 

এই পোস্টটি পড়ার পর আপনার মনে হবে আপনি অনেক কপাল করে এসেছেন যার ফলে, আপনি আধুনিক বিজ্ঞান যুগের মানুষ। এখন অপারেশন রুম মানুষের কাছে মোটেই ভয়ংকর না। বরং সুখের কারণ, বড় কোনো যন্ত্রণা থেকে হয়তো সে মুক্তি পেতে যাচ্ছে। সকল ডাক্তারের একবার হলেও মনে আসে সার্জন হওয়ার কথা। কাদের অবদান এই শল্য চিকিৎসায় সেই গল্পই আজ বলব।

সার্জারিকে হাতের কাজ হিসেবে ধরা হয়। সার্জারি (Surgery) শব্দটা এসেছে গ্রিক শব্দ “Cheirourgia” থেকে। “Cheir” অর্থ হাত এবং “Ergon” অর্থ কাজ।

যে কোন সার্জারিতে মূলত তিনটি অসুবিধা।

১. রক্তপাত (Bleeding)

২. ব্যথা (Pain)

৩. সংক্রমণ (Infection)

এই তিনটি জিনিসের সাথে যুদ্ধ করেই আজ আধুনিক শল্য চিকিৎসার উদ্ভাবন। প্রাচীনকাল থেকে সার্জারির জন্য বিভিন্ন সার্জিক্যাল ইন্সট্রুমেন্ট ব্যবহার করা হয়। ভারত ও দক্ষিণ আমেরিকায় ক্ষতস্থান উইপোকা বা গুবরেপোকার মাধ্যমে সেলাই করা হতো! (ক্ষতস্থানে পোকাগুলো কামড় দিলেই মাথাটা সেখানে রেখে বাকি দেহ ফেলে দেওয়া হতো, যা অনেকটা স্টেপলারের মতো কাজ করত। মায়ান সভ্যতা নিয়ে মুভি Apocalypto-তেও ব্যাপারটা দেখানো হয়েছে)। মায়ানদের মধ্যে দাঁতের ক্যাভিটিতে মূল্যবান পাথর ভরে ডেন্টাল সার্জারি করার উদাহরণও আছে।

সবচেয়ে প্রাচীন সার্জারি হিসেবে ধরা হয় Trepanning খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ সালের দিকে মাথার খুলি ফুটো করে ইনট্রাক্রেনিয়াল প্রেসার কমিয়ে মাইগ্রেনসহ বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা করা হতো। একেই বলা হয় Trepanning প্রাচীনকালে গ্রিকদের একটি আবিষ্কার ছিল Blood letting এই পদ্ধতিতে, রোগীর শরীর থেকে কিছু রক্ত বের করে নেওয়া হতো। তাঁদের ধারণা ছিল- মানুষের শরীর চারটি মোলিক উপাদানে গঠিত- মাটি, আগুন, পানি, বাতাস। এগুলো থেকে চারটি দেহরসের সৃষ্টি হয়- কালো পিত্ত (Black bile), হলুদ পিত্ত (Yellow bile), শ্লেষ্মা (Phlegm) এবং রক্ত (Blood)। সমস্ত প্রাচীন চিকিৎসাবিদ্যার ভিত্তিই ছিল এই যে, এই চারটি দেহরসের কোনো একটির মাত্রা বেড়ে গেলেই রোগের সৃষ্টি হয়। আবার পরিমাণ আগের মাত্রায় আনলেই রোগ সেরে যায়। তাই কিছুটা রক্ত বের করে দেওয়াই এর সমাধান!

শল্য চিকিৎসার ইতিহাস

অনেক বছর পার করে মধ্যযুগে চলে আসলেও, মানুষের কতগুলো বদ্ধমূল কুসংস্কারের জন্য বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা পদ্ধতি বেশি দূর এগোতে পারেনি। তখন যারা সার্জারি করতো তাঁদের তেমন কোন পুঁথিগত বিদ্যা ছিল না। এসম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়ানোও হতো না। এটাকে মোটামুটি নিম্নস্তরের পেশা বলে মনে করা হতো। অনেক নাপিতরাও তখন সার্জারি করতো। অনেকে নিজে নিজে শিখে ফ্রিল্যান্সিং উপায়ে সার্জারি করতো। এর জন্য ব্যবহার করা হতো ধারাল করাত, হাতুড়ি, বাটাল, ছুরি, লোহার রড, ইত্যাদি।

যুদ্ধ বাঁধলে তাদের চাহিদা বেড়ে যেত। প্রথমদিকে আহত সৈনিকদের একমাত্র চিকিৎসা ছিল আহত অঙ্গ কেটে ফেলে দেওয়া (Amputation)। মনে করা হতো, বিপক্ষ দলের অস্ত্রে বিষ আছে। আর সেই বিষ যাতে শরীরে ছড়াতে না পারে, এজন্য যত দ্রুত সম্ভব Amputation করা হতো। তখনো এনেসথেসিয়া সম্পর্কে কারও ধারণা না থাকায় সজ্ঞান অবস্থায়ই এটা করা হতো। এসবের জন্য যে প্রচুর রক্তপাত হতো, তা গরম লোহার ছ্যাকা দিয়ে বন্ধ করা হতো। তার জন্য লম্বা লোহার রডকে আগুনে পুড়িয়ে লাল করা হতো, এরপর রক্তপাতের জায়গায় সেটাকে চেপে ধরা হতো। এই পদ্ধতির নাম ছিল কটারাইজেশন (Cauterization)।
বন্দুকের গুলিকেও বিষাক্ত বলে মনে করা হতো। এজন্য গুলিবিদ্ধ লোকের গুলি বের করে ক্ষতস্থানে ফুটন্ত তেল ঢেলে দেওয়া হতো বিষ নষ্ট করার জন্য। আঘাতের যন্ত্রণার থেকে চিকিৎসার যন্ত্রণা বেশি হতো। আবার চিকিৎসা করালেও খুব কম মানুষ বাঁচত।
অসুখ সম্পর্কে মানুষের দুর্বলতা স্বাভাবিক। মজার ব্যাপার হচ্ছে, আজকের দিনের মতো তখনো হাতুড়ে ডাক্তার বা কোয়াকরা মানুষের এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে পেশা জমাবার চেষ্টা করত। সহজ সরল লোকদের চিকিৎসার নামে কুচিকিৎসা করে প্রায়ই তাঁদের জীবন সংশয় করে তুলত। রোগ নিরাময়ের পরিবর্তে রোগীর জীবন নিয়ে টানাটানি চলত। তাঁদের প্রধান ওষুধের মধ্যে অন্যতম ছিল রক্ত, থুথু, মোরগের ঝুটি, পশুপাখির পালক, নখ, সাপের চামড়া, পশম, উকুন, ঘাম ইত্যাদি!
১৫৪৩ সালে আন্দ্রে ভিসেলিয়াস (Andreas Vesalius) প্রথম মানবদেহ ব্যবচ্ছেদ করার আগ পর্যন্ত অ্যানাটমি শিখতে জন্তু-জানোয়ারের দেহ ব্যবচ্ছেদ করা হতো। মনে করা হতো, সব মানুষ এবং অন্যান্য পশুর দেহের অভ্যন্তরের গঠন একই রকম! সেই হাস্যকর পদ্ধতির বিরুদ্ধে প্রমাণসহ কথা বলতে গিয়েও ভিসেলিয়াসকে কম অপদস্থ হতে হয়নি।
হাসপাতালে তখন মুষ্টিমেয় সার্জন ছিলেন, যারা শুধু ক্ষতের চিকিৎসা করতেন। এছাড়া শিক্ষিত কিছু ডাক্তার ছিলেন। কিন্তু তাঁরা ছিলেন সম্মানিত লোক এবং প্রায় সবাই-ই রাজা-রাজড়াদের চিকিৎসক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন বলে সাধারণ লোকের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকতেন।
আরও প্রায় ৩৫০ বছর লেগে গেছে লোহার ছ্যাঁকা ও তেল ঢালার বদলে ক্ষতস্থান সেলাই করার নিয়ম চালু হতে হতে। কিন্তু তবুও রোগীর মৃত্যুর সংখ্যা কমেনি। তখন হাসপাতালে অপারেশনের সময় যন্ত্রপাতি, ক্ষতস্থান, ইত্যাদি জীবাণুমুক্ত করার কোনো নিয়ম ছিল না। সার্জনরা কালো রঙের লম্বা গাউন পরতেন যেটা কখনো ধোঁয়া হতো না। ধুলাবালি ও রক্তে ভরা এই পোশাক তাঁদের পেশার চিহ্ন ছিল। মনে করা হতো, যার গাউন যত বেশি ময়লা ও পুরাতন, তিনি তত বেশি অভিজ্ঞ ও জ্ঞানী। ফলস্বরূপ, ৯৫% রোগী গ্যাংগ্রিন হয়ে মারা যেত। (যদিও কেউই বুঝতে পারতো না এই মৃত্যুর কারণ কী)। মৃত্যুর ব্যাপারটাকে সবাই খুব সহজভাবে নিত। কথিত আছে যে, যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়া সৈনিকের চেয়েও অপারেশন টেবিলে শোয়ানো রোগীর জীবনের ঝুঁকি অনেক বেশি বলে মনে করা হতো।
দেড়শো বছর আগে, অর্থাৎ গত শতাব্দীতেও পেটের (এবডোমিনাল) অপারেশনে মৃত্যুর হার ছিল শতকরা ৯৯% । যদিও আজ এরকম অপারেশনে মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় নেই বললেই চলে। কিন্তু তখনকার দিনে প্রচলিত ছিল যে, পেটের ক্ষত খুবই মারাত্মক! এক্ষেত্রে মৃত্যু ঘটলে চিন্তা করার কিছু নেই, বেঁচে গেলেই বরং সেটা বিস্ময়কর!
মানুষের এই অসহায় মৃত্যু দেখে অনেক সার্জনই মনে মনে দুঃখ পেতেন। কিন্তু তবুও গৎবাঁধা পদ্ধতিগুলোকেই সবাই নীরবে মেনে চলতেন। পুরাতন নিয়মগুলোকেই সম্মান করতেন, ফলে আর কোনো নতুন গবেষণা চালানো হতো না। কিন্তু তাই বলে কি কখনোই কেউ গবেষণায় এগিয়ে আসেননি? এসেছিলেন। আর এসেছিলেন বলেই আজ সার্জারির ক্ষেত্রে এমন আকাশ-পাতাল উন্নতি সাধন সম্ভব হয়েছে!
আধুনিক সার্জারির এত সফলতা মূলত তিন ক্ষেত্রে উন্নতির জন্য-
১) বৈজ্ঞানিক উপায় অবলম্বন
২) এনেস্থেসিয়ার ব্যবহার
৩) স্টেরিলাইজেশন এবং এন্টিসেপটিকের ব্যবহার

 

Facebook Comments
পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন: