মানুষ মারা গেলে কী হয়?

যে জন্ম নিবে তারই মৃত্যু আছে । এক কোষ থেকে শুরু করে প্রত্যেকটা ব্যাকটেরিয়া পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করে। আর এটা সবাই বিশ্বাস করে । আর মারা গেলে কী হয় এই উত্তর সবাই ধর্ম দিয়ে করতেই পছন্দ করে,  তবে আমাদের এই আলোচনা নিজ দায়িত্বে পড়তে হবে কারণ আমরা এখানে বিজ্ঞান ভিত্তিক আলোচনা করবো কোন ধর্ম ভিত্তিক না । যদিও এটারও একটা ব্যাখ্যা দেয়া যায়। প্রত্যেকটা ধর্ম আত্মার মৃত্যুতে বিশ্বাসি।  অর্থাৎ  মৃত ব্যাক্তির দেহ যেখানেই যাক শাস্তি অথবা শান্তি পাবে তার আত্মা। আত্মা তাহলে কী ?

সংস্কৃতে ‘আত্মা’ (ātman) শব্দটির উৎস হল ‘আত’ (AT) অর্থাৎ ‘ঘুরে বেড়ানো বা ভ্রমণ (to wander) এবং ‘আন’ (AN) অর্থাৎ ‘শ্বাস’ (Breath)। তাই উৎস অনুযায়ী ‘আত্মা’ অর্থ হল ‘একজন মানুষের সেই অংশ যা এক দেহ থেকে অন্য দেহে ঘুরে বেড়ায় এবং শ্বাস বা প্রাণের সাথে সম্পর্কিত’।

আমরা বলি ‘আত্মা’-র ইংরেজী হল ‘Soul’। এটি সঠিক নয়। আব্রাহামিক ধর্মগুলিতে (যেমন- ইহুদী, খ্রিষ্টান, ইসলাম ইত্যাদি) ‘Soul’ এর ধারণা আছে। হিব্রু ভাষায় ‘Soul’ এর প্রতিশব্দ হল ‘nefesh’ (আরবীতে ‘nafs’) যার অর্থ ‘শ্বাস’। তবে আব্রাহামিক চিন্তন অনুযায়ী শুধুমাত্র মানুষেরই soul থাকে (যা তার প্রকৃত অর্থের সাথে মেলে না কারণ পশুপাখি, উদ্ভিদ- এরাও শ্বাস নেয়)

অন্যদিকে, হিন্দু দর্শনে ‘আত্মা’ হল এমন কিছু যার বৈশিষ্ট্য হল ‘চেতনা’ (Consciousness) যা সরাসরি সম্পর্কিত প্রাণের সাথে। ‘প্রাণ’ আত্মাকে দেহের সাথে যুক্ত করে। এইজন্য হিন্দু দর্শন অনুযায়ী মহাবিশ্বের সমস্ত জীবের মধ্যেই আত্মা আছে, শুধু মানুষ নয়।

Soul হল একটি আধ্যাত্মিক বস্তু যাকে একটি জাগতিক বস্তু (দেহ) ধারণ করে। এর ফলে জাগতিক দেহের মধ্যে ‘স্বতন্ত্রতা’ (individuality)-র ধারণা সৃষ্টি হয়। অপরদিকে ‘আত্মা’ হল একটি চেতনাযুক্ত বস্তু যা সাময়িকভাবে একটি দেহে বাস করে এবং স্বতন্ত্র নয় (beyond individual notion and more absolute and universal)। গীতাতে বলা হয়েছেঃ দেহ হল একটি বস্ত্রের মত যেটা ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়লে ব্যবহারকারী তাকে বাতিল করে নতুন আরেকটি বস্ত্র ব্যবহার করে। কিন্তু এসব কোন কিছুই নিয়েই আমাদের আলোচনা না । আমাদের আলোচনা মৃত্যুর পর আমাদের দেহের কী হবে?

মৃত্যুর পর দেহের কী হবে?

চিকিৎসা বিজ্ঞান অনুযায়ী মৃত্যু দুই ভাবে হতে পারে। ব্রেইন তার কাজ বন্ধ করে দিলে অর্থাৎ ব্রেইন সমস্ত সিগনাল আদান প্রদান করা বন্ধ করে দিলে আপনি মারা যাবেন। আরেকটা হচ্ছে হার্ট তার কাজ বন্ধ করে দিলে আপনি মারা যাবেন। ব্রেইন এর মাধ্যমে যদি মৃত্যু হয় তাহলে তাকে বাঁচানোর আর কোনই সম্ভাবনা নেই। কিন্তু যদি কার্ডিয়াক মৃত্যু ঘটে তবে তাকে মৃত্যুর হাত থেকে বাচানোর ক্ষীণ সম্ভাবনা থেকেই যায়। আমাদের দেশের বেজবাবা সুমন এর সাথে এমনটা ঘটেছিল। তার হার্ট কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছিল। চিকিৎসকরা অনেক কষ্টে তাকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন।

মৃত্যুর পর সর্বপ্রথম দেহের যে পরিবর্তন আসে হলো, প্রথমে অ্যালগর মরটিস (মৃতদেহের তাপমাত্রা) ঘরের তাপমাত্রায় না-আসা পর্যন্ত দেহের তাপমাত্রা প্রতি ঘণ্টায় ১.৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট করে কমতে থাকে। লিভোর মরটিস বা লিভিডিটি- এ ক্ষেত্রে দেহের নিচের দিকে রক্ত এবং তরল পদার্থ জমা হয়। মৃতদেহের ত্বকের আসল রঙ ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়ে গাঢ় বেগুনি-নীল রঙ ধারন করে।

শরীরের মধ্যের জিনিষ গুলো একবার বেরিয়ে আসার পরে মৃত ব্যাক্তির মুখ থেকেও শব্দ বের হতে শোনা যেতে পারে। যে চিকিৎসকগন এবং নার্সরা মৃতদেহের পাশে কাজ করেন তারা প্রায়ই এব্যাপারে অভিযোগ করেন যে মৃত ব্যাক্তি হতে অস্বাভাবিক শব্দ শোনা যাচ্ছে এবং অনেক সময় মানুষটি জীবিত রয়েছে এরকম বলেও মনে হতে পারে। তো আপনার থেকেও এরকম শব্দ আসতে পারে, তবে এরমানে এটা নয় আপনার মধ্যে এখনো জান বাকি রয়েছে, এগুলো হতে পারে পেশী সংকোচন এর শব্দ!

রিগর মরটিস- এ ক্ষেত্রে দেহ থেকে অত্যধিক ক্যালসিয়াম ক্ষরণের ফলে পেশিগুলো শক্ত হয়ে যায়। ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত এই অবস্থা থাকে। এই সময় চোখ খোলা থাকতে পারে। বেশ কিছুক্ষণের জন্য মৃতের চোখ খোলাই থাকে। এর পর দেহে পচন ধরতে শুরু করে। রক্ত চলাচল বন্ধ হলে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের গঠন শুরু হয়, অম্লের মাত্রা বাড়তে থাকে। এর ফলে কোষগুলোতে ভাঙন ধরে। ২ থেকে ৩ দিনে দেহ পচতে থাকে। পরিপাক নালীতে থাকা ব্যাকটেরিয়া এবং আণুবীক্ষণিক প্রাণীরা দেহের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় তলপেট সবুজ বর্ণ ধারণ করে এবং তাতে গ্যাস তৈরি হয়। তার চাপে শরীরের মলমূত্র নিষ্কাশিত হয়।

পিউট্রেসিন এবং ক্যাডাভেরিনের মতো জৈবিক যৌগ শিরা-উপশিরায় ছড়িয়ে পড়লে, দুর্গন্ধ বের হতে শুরু করে। এই গন্ধই মৃতদেহের অন্যতম বৈশিষ্ট। নেক্রোসিস পদ্ধতিতে এর পর দেহের রঙ সবদিক থেকে কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করে। মৃতদেহের দুর্গন্ধে আকৃষ্ট হয়ে ভিড় জমায় উচ্ছিষ্ট-ভোগী পোকা-মাকড়। মৃতদেহকে খাদ্যভা-ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এ তো গেল শুধু প্রথম সাতদিনের বৃত্তান্ত। এর পর ধীরে ধীরে প্রাণহীন মৃতদেহ ক্রমে মাংস-চামড়ার খোলস ত্যাগ করে পরিণত হয় হাড় সর্বস্ব কঙ্কালে ।

ব্যাকটেরিয়া বা জীবাণুর খাবার হওয়া ছারাও মাটির নিচে আপনি বিভিন্ন পোকামাকড়, উদ্ভিদ, বা পশুর খাদ্যে পরিণত হতে পারেন। অনেক বিশেষজ্ঞগণ’দের মতে মাটির নিচে আপনার ৮-১২ বছরের মতো সময় লেগে যেতে পারে যখন আপনি সম্পূর্ণ কঙ্কালে পরিণত হওয়া ছাড়া আর কিছুই থাকবেন না। মোটামুটি ৫০ বছর পরে আপনার হাড় হাড্ডি গুলোও মাটির সাথে মিশে যাবে এবং আপনি সম্পূর্ণরুপে এই পৃথিবীর একটি অংশ হয়ে দাঁড়াবেন। এবার নিশ্চয় বুঝতে পারবেন মারা গেলে কী হয়।

আরও পড়ুনঃ মস্তিষ্ক দ্বারা কম্পিউটার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব?

Facebook Comments