মানুষ কাঁদে কেন?

মানুষ কাঁদে কেন?
 

এই লিখাটি লিখতে বসে প্রথম মনে হয়েছে ছোট বেলায় যে কথায় কথায় কেঁদে দিত তাকে আমরা বলতাম ফ্যাত কাঁদুনি। কিছু হলেই কেঁদে দেয়। মানুষ কাঁদে কেন? মানুষের শুরুই হয় অবশ্য কান্না দিয়ে । দেখা যাক আজ কতটুকু জানা যায়।

কান্না হচ্ছে আবেগের প্রতি সাড়া দিয়ে চোখ দিয়ে জল পড়া। চোখের উপরের পাতায় থাকে অশ্রুগ্রন্থি (tear gland or lacrimal gland)। এখানে অশ্রুর উৎপত্তি। চোখের উপরের অংশের কর্নিয়া এবং শ্বেততন্তুতে থাকে অনেকগুলো ছোট ছোট অশ্রুনালী( tear ducts)। এই নালী পথে অশ্রু পুরো চোখে ছড়িয়ে যায়। এভাবে অশ্রু চোখকে আর্দ্র রাখে। অশ্রনালী ছড়িয়ে থাকে নাসাগহ্বরেও। যখন কোনো শক্তিশালী আবেগ আমাদের নাড়া দেয় অর্থাৎ আবেগের বিস্ফোরণ ঘটে তখন চোখ দিয়ে তো অঝোরে জল ঝরেই, নাক দিয়েও ঝরে। একেই বলে “নাকের জলে চোখের জলে এক হওয়া”! এখন প্রশ্ন হচ্ছে মানূষ সুখ দুঃখেই কাঁদে ?

তিন ধরণের কান্না বা চোখের পানি রয়েছে।

১. বেসাল কান্না

২. রিফ্লেক্স কান্না ও

৩. আবেগের কান্নামানুষ কাঁদে কেন?

বেসাল কান্না

এ ধরণের কান্না কাঁদতে হয় না, সব সময় আমাদের চোখের ভেতরেই থাকে। এটা এমন এক ধরণের পিচ্ছিল তরল যা আমাদের চোখকে সব সময় ভেজা রাখে। এর কারণেই আমাদের চোখ কখনো একেবারে শুকিয়ে যায় না।

এক গবেষণায় জানা যায়, আমাদের চোখ প্রতিদিন ৫ থেকে ১০ আউন্স বেসাল কান্না তৈরি করে।

রিফ্লেক্স কান্না

কখনো তোমার মা’কে পেঁয়াজ কাটতে দেখেছো কিংবা নিজে কখনও পেঁয়াজ কেটেছো? চোখ দিয়ে কেমন গরগর করে পানি চলে আসে, তাই না!

রিফ্লেক্স কান্না হলো এমন। এর কাজ হলো আকস্মিক কোন আঘাত, চুলকানি, যন্ত্রণা বা সংবেদনশীল কোন বস্তু থেকে চোখকে রক্ষা করা। এ কান্না কাঁদতে হয় না, প্রয়োজনের সময় নিজ থেকেই টপটপ করে পড়তে শুরু করে।

ধুলো, প্রচণ্ড বাতাস বা ধোঁয়ার কারণে রিফ্লেক্স কান্না আসে। কর্নিয়ার সংবেদী স্নায়ুর মাধ্যমে এ কাজটি চোখ নিজে থেকেই সেরে নিতে পারে।

বিপদ বা আঘাতের সময় এ সংবেদী স্নায়ু সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং মস্তিষ্কে সংবাদ পাঠায়। মস্তিষ্ক সংবাদ পেয়ে চোখের পাতায় দ্রুত বিশেষ হরমোন পাঠায়। আর তাতেই রিফ্লেক্স কান্না তৈরি হয়।

আবেগের কান্না

এ কান্না শুরু হয় সেরেব্রাম থেকে। সেরেব্রাম হলো মস্তিষ্কের সবচেয়ে বড় অংশ, এজন্য সেরেব্রামকে বলা হয় ‘গুরুমস্তিষ্ক’। সেরেব্রামেই থাকে আমাদের সব ধারণা, কল্পনা, চিন্তা-ভাবনা, মূল্যায়ন ও সিদ্ধান্ত।

অন্তঃক্ষরা তন্ত্র আমাদের চোখে হরমোন পাঠায়। এটিই জল হয়ে চোখের ভেতরে থাকে। যখনই আমরা কান্না, বেদনা, আঘাত বা শোকে থাকি তখন এ জল কান্না হয়ে চোখ দিয়ে পড়তে শুরু করে।

প্রোল্যাক্টিন এবং টেস্টোস্টেরণ ছাড়াও কান্নায় আরো কিছু হরমোন এবং নিউরোট্রান্সমিটারের ভূমিকা আছে। সেরকম একটি হরমোন হচ্ছে সেরেটোনিন। গবেষণায় দেখা গেছে বাচ্চা জন্মদানের পরে শরীরে ট্রিপটোফ্যান (সেরেটোনিন ক্ষরণ ত্বরান্বিত করে) কমে যায়। ফলে আবেগীয় ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয় এবং কান্নার প্রবণতা বাড়ে। প্রেমে পড়লেও ট্রিপটোফ্যান কমে যায়। এজন্যই দেখবেন প্রেমাক্রান্ত লোকজন বেশি কাঁদে ।

কাঁদা ভালো না খারাপ ?

পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে ATCH ( Adrenocorticotropic hormone ) ক্ষরিত হয়। এর প্রভাবে এড্রেনাল গ্রন্থি থেকে কর্টিসল( fight or flight response hormone ) উৎপন্ন হয়। এই কর্টিসল রক্তচাপ বাড়ায়, রক্তে শ্যুগারের পরিমাণ বৃদ্ধি করে যা আমাদের শ্বাসপ্রশ্বাসের হার বাড়িয়ে তোলে। আরো বিভিন্ন শারীরতাত্ত্বিক পরিবর্তন আমাদেরকে কাজ করতে উদ্দীপ্ত করে। এর ফলে মানসিক চাপের সৃষ্টি হয়। এই চাপ কমানোর মোক্ষম অস্ত্র হচ্ছে কান্না। কান্নাকাটির পর শান্ত অনুভব করার অভিজ্ঞতা আমাদের সবারই আছে। এর কারণ হল – কাঁদলে অতিরিক্ত ATCH বের হয়ে যায় এবং কর্টিসোলের পরিমাণ কমে যায়। ফলে চাপ কমে যায়। আমাদের শরীরে থাকা চাপ নিবারক আরেকটি উপাদান হচ্ছে লিউসিন এনকেফালিন (leucine enkephalin)। আবেগজনিত অশ্রুর সাথে এটি নিঃসৃত হয়। এটি ব্যথা কমায় এবং মানসিক অবস্থার উন্নতি ঘটায়। পেইনকিলার হিসেবে আমরা যে ওষুধগুলো খাই লিউ এনকেফালিন অনেকটা সেরকম কাজ করে ।

কতটুকু কান্না স্বাভাবিক?

শিশুদের জন্য প্রতিদিন তিন ঘন্টা কাঁদা স্বাভাবিক। এর চেয়ে বেশি কাঁদলে বুঝতে হবে তাদের চিকিৎসা দরকার। ঠান্ডা লাগা বা অন্য কোন সমস্যার কারণে এমন হতে পারে। প্রাপ্তবয়স্কদের কান্নার ক্ষেত্রে কোনো ম্যাজিক নাম্বার বা সময় আসলে নাই। কান্নার পরিমাণ অনেকাংশেই প্রভাবিত হয় মানুষের পরিবেশ দ্বারা। আপনি কতটুকু কাঁদছেন তা বলে দেয় আপনি মানসিকভাবে কতটুকু সুস্থ। অতিরিক্ত কান্নাকাটি ডিপ্রেসনের লক্ষণ হতে পারে। আবার একেবারে না কাঁদা বা কম কাঁদাটাও তীব্র ডিপ্রেসনের উপসর্গ হতে পারে। এই ব্যাপার নিয়ে বিতর্ক আছে। যেমন – নেদারল্যান্ডসের গবেষকরা বেশি কান্না বা কম কান্না ডিপ্রেসনের লক্ষণ এই দাবীর পক্ষে জোরালো কোনো প্রমাণ পাননি।

কান্না নিয়ে চারটি মজার তথ্য

১. এক গবেষণায় দেখা গেছে একজন নারী প্রতিমাসে ৫.৩ বার কাঁদে, একজন পুরুষ কাঁদে ১.৪ বার।

২. আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে একটা শিশু প্রতিদিন ১ থেকে ৪ ঘণ্টা কাঁদে।

৩. যদি কান্নার প্রতিমাণ বেড়ে যায় তাহলে নাক দিয়েও কান্না বের হয়ে আসতে পারে। এতে করে সাময়িকভাবে নাক বন্ধ হয়ে যায়।

৪. পেঁয়াজ কাটলে আমরা কাঁদি কেনো! কারণ, পেঁয়াজ কাটলে এর ভেতর থেকে প্রোপেন ইথিয়ল সালফার অক্সাইড গ্যাস বের হয়ে আসে। এটি বাতাসে ভেসে আমাদের চোখের সংস্পর্শে চলে আসে, ফলে আমাদের চোখ থেকে জল পড়ে।

আরো পড়ুনঃ দেজা ভু: একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি

Facebook Comments
পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন: