মানুষের হাঁচি হয় কেন?

মানুষের হাঁচি হয় কেন

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় হাঁচিকে বলা হয় “Achoo” অথবা “Sternutation”। আর ইংরেজিতে বলা হয় “Sneeze” (স্নীজ্‌) যা ল্যাটিন শব্দ “Sterno” থেকে এসেছে, যার অর্থ হচ্ছে বিস্তৃত করা, প্রসারিত করা বা ছড়িয়ে দেয়া। হাঁচি একটা বিস্ময়। হাঁচি আসলে মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। একদম শেষের দিকে কোন দিকে মুখ করে হাঁচি দেবেন এটা শুধু মানুষের নিয়ন্ত্রণে!

আপনি যখন হাঁচি দেন ঘন্টায় প্রায় ১০০ মাইল বেগে নাক দিয়ে বাতাস বেরিয়ে আসে। আর এর সাথে বেরিয়ে আসা জলীয়পদার্থ প্রায় পাঁচ ফুট দূরত্ব পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে। হাঁচির স্প্রের কথা ভুলে গেলে চলবে না – প্রায় ২০০০ থেকে ৫০০০ জীবাণুযুক্ত তরলপদার্থ নাক-মুখ দিয়ে হাঁচির মাধ্যমে বেরিয়ে আসে। আমাদের দেহের অ্যাবডোমিনাল বা পেটের পেশি, বুকের পেশি, ডায়াফ্র্যাম বা বক্ষ-উদরের মধ্যে উপস্থিত পেশি, স্বরযন্ত্র নিয়ন্ত্রণকারী পেশি এবং কণ্ঠের পেছনের পেশি একটি হাঁচি সম্পন্ন হতে সাহায্য করে থাকে। হাঁচি হওয়ার জন্যে এক সেকেন্ডেরও কম সময় লাগে। যদি নাক বন্ধ করে হাঁচি দেয়া হয়, তবে তা 176mmHg বায়ু চাপের সমান চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এটা আপনার শ্রবণ শক্তিকে এবং চোখকে নষ্ট করে দিতে পারে।  তাই আপনার হাঁচি আপনি গর্বের সাথে উড়িয়ে দিন। তবে বাতাসে নয়, রুমালে। আর অনেকে বলে থাকেন যে, হাঁচির সময় পাপকিন বা পাইনাপেল বললে হাঁচিটা সহজে বের হয়ে যায়।

হাঁচি কীভাবে হয়?

আমাদের নাকের বাইরের অংশের দিকে লোম থাকে। এটা আসলে এমনি এমনি থাকে না । এই লোম নাকের ভিতরে ধূলোবালি আটকাতে সাহায্য করে। এই লোম পার হয়ে যখন কোনো কিছু নাকের ভিতরে প্রবেশ করে তখন হাঁচি হয়। ঝাঁঝাঁলো বা কড়া গন্ধ থেকেও হাঁচি হতে পারে। আসলে ধূলোজাতীয় কোনো পদার্থ হোক আর কোনো গন্ধই হোক না কেন, আমাদের নাকের ভেতরে উত্তেজনা বা সুড়সুড়ি সৃষ্টি হলেই আমাদের হাঁচি হয়। হাঁচি দেবার সময় আমাদের স্নায়ুতন্ত্র এবং পেশিতন্ত্র উভয়ই একসাথে অতিদ্রুত কাজ করে থাকে।

হাঁচিকে সাধারণত দু’টি পর্বে ভাগ করা যায়।

১. সংবেদনশীল পর্ব

২. বহির্মুখী বা শ্বাস-প্রশ্বাস সংক্রান্ত পর্ব

হাঁচির জন্য দায়ী কোনো উপাদান বা গন্ধ নাকের ভেতরে মিউকোসা অংশে পৌঁছালে সেখানে উত্তেজনা বা সুড়সুড়ি জাতীয় অনুভূতি সৃষ্টির কারণে হিস্টামিন নামক একধরনের পদার্থ নিঃসৃত হয়। যা মিউকোসা স্তরের নিচে ছড়িয়ে থাকা ট্রাইজেমিনাল স্নায়ু কোষকে উত্তেজিত করে। আর এর ফলাফল স্বরূপ একটি সংকেত আমাদের ব্রেনের হাঁচি কেন্দ্রে চলে যায়। ট্রাইজেমিনাল স্নায়ুটি আমাদের করোটির ১২টি স্নায়ুর মধ্যে ৫ম স্নায়ু যা কিনা আমাদের মুখের চামড়ার নিচে, পাশাপাশি নাকের কোমল মিউকোসা স্তরের নিচে ছড়িয়ে থাকে। আর আমাদের নাকের ভেতরের মিউকোসা স্তরটি আমরা নাকের ভেতরে আঙুল দিলে সেটার অস্তিত্ব টের পেতে পারি। আমাদের নাকের দুইটি ছিদ্রের মাঝে অবস্থিত পাতলা তরুণাস্থির উপরে এই মিউকোসা স্তরটি বিদ্যমান।

নাকের চামড়ার নিচে থাকা ট্রাইজেমিনাল স্নায়ুর অংশগুলো খুবই সংবেদনশীল বা স্পর্শকাতর হয়ে থাকে। যখন ট্রাইজেমিনাল স্নায়ু উত্তেজিত হয় তখন একটি সংকেত সাথে সাথে ব্রেনের একটি বিশেষ অংশ- মেডুলাতে পৌঁছে যায় এবং মেডুলার পাশে আঘাত করে। এই মেডুলা নামক অংশটিকেই হাঁচি কেন্দ্র বলা হয়।

হাঁচি যেমন প্রক্রিয়া ঘটে:

চোখ বন্ধ হয়ে যায়। (যদি হাঁচি দেবার সময় আপনার চোখ বন্ধ না হয়, তবে সম্ভবতঃ যে ক্রিয়া স্বাভাবিকভাবে হবার কথা তা ঘটেনি এবং এটা রোগীর এ বিষয়টি নির্দেশ করে যে, এই ধরণের হাঁচি স্বাভাবিক না বরং অস্বাভাবিক হাঁচি। যা রোগীর মানসিক সমস্যা আছে বলে নির্দেশ করে।)

গভীর নিশ্বাস বা বড় দম নেয়া হয়। এটাকে ধরে রাখেন, যেটা আপনার বুকের মাংস পেশিকে শক্ত করে দেয়।

শ্বাসরন্ধ্র বন্ধ হয়ে যাবে।

জিহ্ববা মুখের ওপরের বিপরীতে চাপ দিবে।

ফুসফুসে বাতাসের চাপ বৃদ্ধি পাবে। বুকের পেশিগুলো আমাদের ফুসফুসকে দ্রুত সংকুচিত করে, ফলে একটি বাতাসের বিস্ফোরণ উপরের দিকে চলে আসে। গলার পেশি শক্ত হয়ে যায়। তখনই আপনি বিস্ফোরণ আকারে মুখ এবং নাক দিয়ে খুব দ্রুত দম ফেলবেন এবং সাথে সাথে আপনার শ্বাসরন্ধ্রের পথ খুলে যাবে।

ব্রেনের কোষের উপর হাঁচির প্রভাব

এ কথা শোনা যায় যে- হাঁচির সময় ব্রেনের কোষ মারা যায়। এ সম্পর্কে বিশিষ্ট স্নায়ু বিজ্ঞানী ডাক্তার রিচার্ড কোললার বলেন যে, “এ কথা সত্য নয়”।

তিনি বলেন যে, “হাঁচি দিলে আমাদের ব্রেনের খুলির মধ্যে কিছুটা চাপের সৃষ্টি হয়। কিন্তু এই চাপের পরিমান খুবই সামান্য এবং চাপটা এতটাই হালকা যে এটি আমাদের ব্রেনের কোষকে ধংস করার মতো যথেষ্ট নয়। যারা কয়েকটি হাঁচি দিয়ে সহজেই কাবু হয়ে যায় তাদের ব্রেনে হাঁচির চাপ পড়ার জন্যে মাথাব্যথা হবার সম্ভাবনা থাকে”।

হাঁচির জন্যে যে ব্রেন কোষ নষ্ট হয়ে যায়, এই ধারণাটা এসেছে ব্রেন স্ট্রোকের কাছ থেকে। কারণ ব্রেন স্ট্রোকের জন্য ব্রেনে অনেক চাপ পড়ে এবং ব্রেনের কোষ নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু হাঁচি দেবার জন্যে ব্রেনে খুবই সামান্য চাপ সৃষ্টি হয় যা ব্রেন কোষকে নষ্ট করতে পারে না, বরং হাঁচির জন্য অল্প সময়ের জন্যে খুব সামান্য মাথাব্যথা হতে পারে।

হৃৎপিণ্ডের উপর হাঁচির প্রভাব

অনেককে বলে থাকে যে হাঁচির সময় হৃৎপিণ্ড বন্ধ থাকে। কিন্তু এ কথা মোটেও ঠিক নয়। বরং হাঁচির জন্য আমাদের বুকের ভেতরে যে বাতাসের চাপের পরিবর্তন হয় তার জন্যে আমাদের দেহে রক্ত পরিবহনের গতি বেড়ে যায়, যা কিনা আমাদের হৃৎপিণ্ডের ছন্দের পরিবর্তন করে থাকে।

সোর্স: উইকিপিডিয়া

আরও পড়ুন: হ্যালুসিনেশন আর ইলিউশন এই দুটোর পার্থক্য কী?

Facebook Comments