মাইকেল ফ্যারাডে : জেনারেটর আবিষ্কারক

মাইকেল ফ্যারাডে : জেনারেটর আবিষ্কারক
 

আমরা সাধারণত বিজ্ঞানী শব্দটা শুনলেই চোখের সামনে ভাসে আইনস্টাইন এর মুখ। তাই মাইকেল ফ্যারাডে কতটা সম্মানীয় এটা বোঝাতে আইনস্টানের ঘরেই যেতে হবে। আলবার্ট আইনস্টাইন তার পড়ার ঘরের দেয়ালে কেবল তিনজনের ছবি ঝুলিয়ে রেখেছিলেন – আইজ্যাক নিউটন, জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল, আর তৃতীয় জন ছিলেন মাইকেল ফ্যারাডে।

মহান বিজ্ঞানী রাদারফোর্ড ফ্যারাডেকে নিয়ে বলেছিলেন, “তার আবিষ্কারগুলোর মাত্রা আর ব্যাপকতা, বিজ্ঞান আর শিল্পকারখানার জগতে সেগুলোর গুরুত্ব বিবেচনা করলেই বোঝা যায় – এই লোকটাকে যত বড় সম্মানই দেয়া হোক না কেন, সেটা যথেষ্ট নয়।”

মাইকেল ফ্যারাডে : জীবন বৃত্তান্ত

প্রথমে আমরা চলে যেতে চায় উইকিপিডিয়ায় তার জন্ম বৃত্তান্ত নিয়ে: জন্ম – ২২শে সেপ্টেম্বর, ১৭৯১। জন্মস্থান – লন্ডন, ইংল্যান্ড। স্ত্রী – সারাহ বার্নার্ড। সন্তান – নেই। ঝোঁক – পদার্থ (বিশেষ করে তাড়িৎ-চৌম্বক), রসায়ন। পুরষ্কার – Royal Medal (দুইবার), Copley Medal (দুইবার), Rumford Medal, Albert Medal. মৃত্যু – ২৫শে আগস্ট, ১৮৬৭। মৃত্যুস্থল – ইংল্যান্ড।

ফ্যারাডের বাবা ছিলেন কামার । দারিদ্রতার সবথেকে কঠিন পর্যায়ে ছিল তার বসবাস। স্কুলে ছিলেন সবচেয়ে দুর্বল ছাত্রদের একজন তিনি। কোনো রকম যোগ-বিয়োগ তিনি পারতেন। তিনি সঠিক ভাবে “র” উচ্চারণ করতে পারতেন না। একদিন ক্লাসে তার শিক্ষক তার নাম জিজ্ঞেস করেন।  কয়েক সেকেন্ড দ্বিধায় থাকার পর স্পষ্ট গলায় বলে উঠলেন, “F-A-R-A-D-A-Y, ফাওয়াডে”। পুরো ক্লাসে হাসির রোল পড়ে গেল। শিক্ষক তার মেজাজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললেন। “নিজের নামটাও ঠিকমতো উচ্চারণ করতে পারিস না? এ কেমন ছাত্র তুই!” হাতের বেত দিয়ে প্রহারের মাধ্যমে জখম করে ফেললেন ছেলেটিকে। ব্যথার তীব্রতায় মাটি থেকে উঠে বসতেও পারছিল না সে।

বেশিদিন চলেনি এভাবে ,  ১৩ কি ১৪ বছর বয়সে স্থানীয় একটা বই বাঁধাই করার প্রতিষ্ঠানে যোগ দিলেন ফ্যারাডে। বস্তুত, এখানেই তিনি নিজেকে স্বশিক্ষিত করেছিলেন। দিনের বেলায় বই বাঁধাই করতেন, রাতের বেলায় বই পড়তেন বসে বসে। প্রথমে অবশ্য এ পথটাও সহজ ছিল না । প্রথমে তাকে বুক ডেলিভারি বয় হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। পরবর্তীতে বই বাঁধাই করার কাজ দেয়া হয়। একবার তিনি একটা বই বাঁধাইয়ের কাজ পেলেন। বইটা বেশ বড় ছিল। সে কি মনে করে মাঝখান থেকে পড়া শুরু করলেন আর তার ভালো লাগলো। বিদ্যুৎ বিষয়ক ধারণা তিনি এখান থেকেই পেয়েছিলেন।

এর কিছুদিন পর ফ্যারাডে শহরে যান। সেখানে একটি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তিনি জানতে পারলেন, সামনের সপ্তাহে বিজ্ঞানী জন টেটাম পদার্থবিজ্ঞানের উপর একটি লেকচারের আয়োজন করবেন। টিকিটের মূল্য মাত্র ১ শিলিং। কিন্তু ফ্যারাডের পক্ষে ১ শিলিং খরচ করার মতো সামর্থ্য ছিল না। সারাদিন মন খারাপ করে বসে থাকলেন তিনি। রাতে তার বড় ভাইয়ের কাছে সবকিছু খুলে বলেন। তিনি ফ্যারাডেকে অনেক স্নেহ করতেন। নিজের ব্যক্তিগত সঞ্চয় থেকে ফ্যারাডেকে একটি শিলিং প্রদান করলেন। জন টেটামের জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা শুনে ফ্যারাডের মাথায় বিজ্ঞানী হওয়ার নেশা চেপে বসলো।

জেনারেটর আবিষ্কার

ফ্যারাডে তার সবচেয়ে পছন্দের বিষয় ‘বিদ্যুৎ’ এবং ‘চুম্বক’ নিয়ে কাজ শুরু করেন। তিনি চুম্বকের বলরেখা আবিষ্কার করেছিলেন। এরপর তিনি একটি বৈদ্যুতিক তারের উপর একটি চুম্বকের প্রভাব নিয়ে কাজ শুরু করেন। একদিন তিনি একটি কুণ্ডলাকৃতির তারের সাথে ব্যাটারির সংযোগ দিলেন। পুরো বর্তনীর সাথে একটি গ্যালভানোমিটার যুক্ত করে দিলেন। এরপর কুণ্ডলীর ভেতর একটি চুম্বক প্রবেশ করান। সাথে সাথে গ্যালভানোমিটারের কাঁটা কেঁপে উঠে। তিনি ফের চুম্বকটি বাইরে বের করে আনার সময় কাঁটা বিপরীত দিকে কেঁপে উঠল। তিনি বিস্মিত হয়ে গেলেন। তিনি এই ধর্মের নাম দিলেন তড়িৎ-চুম্বকীয় আবেশ (Electromagnetic induction)। কিন্তু ফ্যারাডে তখনও সন্তুষ্ট ছিলেন না। তিনি এই ধর্মকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করার চেষ্টায় ছিলেন। কিন্তু প্রথমদিকে বার বার ব্যর্থ হতে থাকেন। তবুও হার মানলেন না। রাতদিন এর পেছনে সময় দিতে থাকেন। একদিন হঠাৎ করে তার মাথায় একটি বুদ্ধি আসলো। তিনি তামার তৈরি চাকতি দিয়ে একটি অদ্ভুত যন্ত্র তৈরি করলেন। এরপর চাকতিটি অবিরাম ঘুরানোর পর সেই যন্ত্রের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হলো। আনন্দে ফ্যারাডে লাফিয়ে উঠলেন। তিনি নতুন বিপ্লবের জন্ম দিয়েছিলেন। আর সেই বিপ্লবের নাম ‘ডায়নামো’। তার জেনারেটর বা ডায়নামোটিকে “ফ্যারাডে ডিস্ক” বলা হয়।

জেনারেটর আবিষ্কারক - মাইকেল ফ্যারাডে

অশ্বক্ষুরাকৃতির একটি চুম্বকের দুই মেরুর মাঝখানে স্থাপিত কপার চাকতির ঘূর্ণন ব্যবহার করে এই যন্ত্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। একটি চৌম্বক ক্ষেত্রের মধ্যে পরিবাহীকে ঘুরালে ইলেকট্রনের প্রবাহ হয়। কোনো পরমাণুর শেষ কক্ষপথের ইলেকট্রন প্রবাহ হলেই তা তড়িতে রুপ নেয়। বিদ্যুৎ নিয়ে মাইকেল ফ্যারাডে কাজ এখানেই থেমে যায়নি। তিনি সম্পূর্ণ নতুন একটি বিষয়ের জন্ম দেন। বিষয়টির নাম ‘Electrochemistry’ বা তড়িৎ রসায়ন। তিনি ‘Anode’, ‘Cathode’, ‘Ion’, ‘Electrode’, ‘Electrolysis’ সহ বহু বৈজ্ঞানিক শব্দের জন্ম দেন। বর্তমানে আমাদের নিত্য ব্যবহার্য বিভিন্ন ধাতব বস্তুর উপর চাকচিক্যপূর্ণ আরেকটি ধাতুর প্রলেপ দেয়া হয়। এর মাধ্যমে বস্তুটির স্থায়িত্ব বৃদ্ধি পায়। দেখতেও সুন্দর লাগে। এ সবই কিন্তু মাইকেল ফ্যারাডে অবদান।

সূত্র: Michael Faraday

আরও পড়ুন: লিসে মাইটনার: অবহেলিত নারী বিজ্ঞানীর গল্প!

 

Facebook Comments
পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন: