ব্ল্যাক হোল রহস্য!

ব্ল্যাক হোল রহস্য

মহাকাশ আমাদের কাছে রহস্যময়। আমরা যখন ঘরে বসে চা খাচ্ছি ঠিক তখন কত কিছু ঘটে যাচ্ছে মহাকাশে। বিজ্ঞানীরা দিনের পর দিন খেটে যাচ্ছে মহাকাশ সম্পর্কে আমাদের তথ্য দেওয়ার জন্য। ব্ল্যাক হোল বোধহয় মহাকাশের সবচেয়ে রহস্যময় জিনিস। মহাকাশের সবচেয়ে ভারী বস্তুটিও হচ্ছে এটি।

ব্ল্যাক হোল কী?

এমন কিছু তারকা বা নক্ষত্র আছে, যাদের অস্বাভাবিক আকার, ভর ও ঘনত্ব থাকে, আর এ জন্যে এই সব তারকা থেকে নির্গত আলো বাইরে আসতে পারে না বলে তারকাটি কে কালো দেখায়! আমরা একে কৃষ্ণ-গহ্বর বা ব্ল্যাকহোল বলে চিনি।

মনে করুন আপনি এমন জায়গায় আছেন সেখান থেকে ব্ল্যাকহোল আপনাকে টেনে নিচ্ছে। তাহলে আপনি সাই করে ব্ল্যাক হোলের মধ্যে ঢুকে যাবেন? না এ ক্ষেত্রে তা ঘটবে না। যদি এমন হয় আপনার পা ব্ল্যাক হোলের দিকে । প্রথমে আপনার পা চুইনগামের মতো হয়ে ব্ল্যাক হোলের দিকে যেতে থাকবে। তারপর আস্তে আস্তে আরো গলতে গলতে নুডুলস এর মতো হয়ে যাবে। যদিও এটা এতো দ্রুত হবে যে একবার পলক ফেলার সময় পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ আছে!

সূর্যের চেয়ে কমপক্ষে দশগুণ বড় নক্ষত্রদের জ্বালানি শেষ হয়ে গেলে এরা সঙ্কুচিত হতে হতে অতি ক্ষুদ্র অন্ধকার বিন্দুতে পরিণত হয়। এ ধরনের ব্ল্যাক হোলকে বলা হয় স্টেলার মেস (Stellar Mass) ব্ল্যাকহোল। বেশিরভাগ ব্ল্যাক হোলই এ ধরনের। আমরা যে গ্যালাক্সিতে বসবাস করছি এর নাম মিল্কওয়ে গ্যালাক্সি। এই গ্যালাক্সিতে প্রায় ১০০ মিলিয়ন ব্ল্যাকহোল রয়েছে। জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে প্রতি সেকেন্ডে একটি ব্ল্যাক হোল সৃষ্টি হয়। আরেক ধরনের ব্ল্যাক হোল হলো সুপার মেসিভ (Super massive) ব্ল্যাকহোল। তাদের এক মিলিয়ন তারার ভর এমনকি এক বিলিয়ন তারার ভরও থাকতে পারে। সুপার মেসিভ ব্ল্যাক হোলরা কোনো গ্যালাক্সির মিলিয়ন বা বিলিয়ন তারাকে একত্রে ধরে রাখে। আমাদের গ্যালাক্সিতেও কিন্তু একটি সুপার মেসিভ ব্ল্যাকহোল আছে। সেটির নাম Sagittarius A*

ব্ল্যাক হোলের আকর্ষণ এতই বেশি যে এর থেকে দৃশ্যমান আলো, এক্স রে, অবলোহিত রশ্মি কিছুই রক্ষা পায় না। এজন্যই ব্ল্যাকহোল আমাদের কাছে অদৃশ্য। বিজ্ঞানীরা তাই ব্ল্যাক হোল নিয়ে গবেষণা করার সময় খেয়াল করেন ব্ল্যাক হোল তার আশপাশকে কীভাবে প্রভাবিত করছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ব্ল্যাক হোল থেকে প্রায়ই উজ্জ্বল গ্যাস ও তেজস্ক্রিয় বিকিরণের ফোয়ারা নিক্ষিপ্ত হয়। এ ধরনের পর্যবেক্ষণ থেকে বিজ্ঞানীরা অতি বৃহৎ ও দারুণ শক্তিশালী ব্ল্যাক হোল আবিস্কার করেছেন।

১৮৮৩ খ্রিষ্টাব্দে জন মিচেল নামে এক পাদ্রী এমন একটি অবস্থার কথা আলোচনা করেছিলেন যা থেকে আলোক রশ্মি নিঃসৃত হতে পারে না। পরবর্তীতে আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্ব অনুসারে দেখা যায়, এই অবস্থাটি এড়ানো যাবে না। কৃষ্ণবিবর সম্পর্কে আমরা জানি এটি নিরেট আঁধার। ইনফিনিটি ডেনসিটির একটা বিন্দু তার কেন্দ্রীয় বিন্দুতে থাকে,যার থেকে আলো বের হতে পারে না। নিউট্রন নক্ষত্র চুপসে এটি কৃষ্ণবিবর এর অবস্থা লাভ করে। নিভে যাওয়া তারার ভৌত ব্যাসার্ধ সোয়ার্জচাইল্ড ব্যাসার্ধ চেয়ে কম হলে অন্য জগতের সাথে যোগাযোগ করার জিওডেসিক থাকে না। এই তারকা থেকে আলোক কণিকা বের হতে পারে না, এটি হয়ে যায় অদৃশ্য। সোয়ার্জচাইল্ড ব্যাসার্ধের ভেতরে থাকা ব্যক্তি অন্য কোনো ঘটনা দেখতে পারে কিন্তু বাইরে এই তথ্য সে পাঠানোর উপায় থাকে না।

         Credit: Scientificamerican

২০১২ সালের ডিসেম্বরে Hlavacek- Larrondo ও অন্যান্য জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বলেন যে কিছু কিছু ব্ল্যাক হোল এতই বড় যে তা ‘আলট্রা ম্যাসিভ’ (Ultra massive) নামের নতুন নাম দাবি করে। এ ধরনের ব্ল্যাক হোল সূর্যের তুলনায় ১০ বা ৪০ বিলিয়ন গুণ বেশি ভর ধারণ করে। Jonelle Walsh নামের আরেকজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী বলেন, “৫ বছর আগেও জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সূর্যের তুলনায় ১০ বিলিয়ন গুণ ভারী ব্ল্যাক হোলের কথা জানত না” অতি বিশাল ভর যুক্ত এসব ব্ল্যাক হোলের আকর্ষণ শক্তি এতই বেশি যে তারা গ্যালাক্সি গুচ্ছকে ধরে রাখতে পারে।

সূর্য কি কোনো সময় ব্ল্যাক হোলে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা আছে?

উত্তর হলো না। সূর্য কোনো সময়ই ব্ল্যাক হোলে পরিণত হবে না! কারণ সূর্য অতটা বড় না যতটা দরকার একটা তারকার ব্ল্যাক হোলে পরিণত হতে। ব্ল্যাক হোল মোটেও স্পেস বা মহাশূন্যের এতটা কাছে ভ্রমন করে না কোনো তারকা, চাঁদ বা গ্রহ কে তার শিকার বানাতে। আর পৃথিবীও কোনো দিন ব্ল্যাক হোলে গিয়ে পতিত হবে না কারণ, কোনো ব্ল্যাক হোল কিন্তু পৃথিবীর সৌরজগতের এতটা কাছাকাছি নয়। যদি সূর্যের সমান ভরের একটি ব্ল্যাক হোল সূর্যের জায়গায় প্রতিস্তাপিত হয়, তবুও নয়।

তথ্যসূত্র:

  1. বিজ্ঞান পত্রিকা
  2. উইকিপিডিয়া

আরও পড়ুন: মহাবিশ্বে আরও ১৮০০ নক্ষত্রের বিস্ফোরণ!

Facebook Comments