ব্ল্যাকহোলের ছবি কি ক্যামেরায় তোলা ছবি?

ব্ল্যাকহোলের ছবি কি ক্যামেরায় তোলা ছবি?
 

ব্ল্যাকহোল নামের মধ্যেই রহস্য। শব্দটা শুনলেই রহস্যের গন্ধ পাওয়া যায়। আমরা কিছু দেখতে পাওয়ার প্রথম শর্ত হচ্ছে আমরা যা দেখতে চাচ্ছি তা থেকে আলো এসে আমাদের চোখে পড়তে হবে । কিন্তু ব্ল্যাকহোলের আকর্ষণ ক্ষমতা এত বেশি যে আলোও বেরিয়ে আসতে পারে না! যার ফলে আমরা এর ভিতরের কিছুই দেখতে পাই না। ব্ল্যাকহোলের অস্তিত্ব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলেছে বিভিন্ন মত-দ্বিমত। সম্প্রতি একটি ব্ল্যাকহোলের ছবি সারা বিশ্বে অনেক আলোড়ন তুলেছে! কিন্তু প্রশ্ন হলো, ব্ল্যাকহোলের ছবিটা কি ক্যামেরায় তোলা ছবি?

আইনস্টাইন নিজেও ধারণা করেছিলেন, তাত্ত্বিকভাবে ব্ল্যাকহোলের অস্তিত্ব সম্ভব হলেও বাস্তবিক অর্থে এর কোনো অস্তিত্ব নেই। প্রমাণিত না হলেও এক্ষেত্রে নিজের তত্ত্বকে অবিশ্বাস করে, তিনি ভুলই করেছিলেন বলা যায়। বিজ্ঞানীরা মানব ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ব্ল্যাকহোলের ছবি তুলে প্রমাণ করে দিয়েছেন আইন্সটাইনের ধারণা ভুল, কিন্তু তাঁর তত্ত্ব সঠিক!

প্রায় প্রতিটা গ্যালাক্সিতেই এক অথবা একাধিক ব্ল্যাকহোলের অস্তিত্ব আছে। আমরা যেখানে আছি অর্থাৎ মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রেও আছে একটি ব্ল্যাকহোল। এর নাম স্যাজিটেরিয়াস এ। পৃথিবী থেকে এই ব্ল্যাকহোলের দূরত্ব ২৬ হাজার আলোকবর্ষ। অথচ যে ব্ল্যাকহোলের ছবি বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি তুলেছে সেটির অবস্থান ৫৫ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে। তাহলে কাছের ব্ল্যাকহোল রেখে এত দূরের ব্ল্যাকহোলের ছবি তোলার জন্য কেন এত বড় আয়োজন? ছবিটা কি আসল ছবি?

ব্ল্যাকহোলের ছবি কীভাবে তোলা হলো?

যে ছবিটা নিয়ে সারাবিশ্বে তোলপাড়, সেই ব্ল্যাকহোলের ওপর ক্যামেরা ফোকাস করে ক্লিকের মাধ্যমে ছবিটি তুলেছে? মূলত ছবি বলতে আমরা যা বুঝে থাকি, ব্ল্যাকহোলের ছবিটি প্রকৃতপক্ষে তা নয়। বরং অসংখ্য তথ্যের সমন্বয়ে গড়া রিকন্সট্রাকশান। মহাশূন্যের যেসব ছবি আমরা দেখি তাদের বেশিরভাগই সাধারণ ক্যামেরায় তোলা ছবি না। বরং রিকন্সট্রাকশান। ছবি হিসেবে আমরা যা দেখি এগুলো আসলে তথ্য। তথ্য থেকে বিজ্ঞানীরা ছবি তৈরি করে আমাদের দেখান। ব্ল্যাকহোলের ছবি কি ক্যামেরায় তোলা ছবি?

মনে করুন, আপনি একটি ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে আছেন। ভিড়ের কারণে আপনি আপনার সামনের সর্বোচ্চ কয়েক জন মানুষের চেহারা দেখতে পাবেন। আপনার সামনের কয়েক জনের পর বাকিদের চেহারা কিন্তু আপনি ভিড়ের কারণে দেখতে পাবেন না। কিন্তু আপনার কাছে যদি এমন কোনো প্রযুক্তি থাকে যার দ্বারা আপনি আপনার সামনের মানুষদের ভেদ করে তাদের পেছনে কী আছে সেগুলো দেখতে পাবেন, কেবল তখনই আপনার পক্ষে আপনার সামনে থাকা বাধার পেছনের জিনিসগুলো দেখা সম্ভব। বিজ্ঞানীরা এই পদ্ধতি অবলম্বন করেই মহাবিশ্বের দূর-দূরান্তের ছবি সাধারণ মানুষের সামনে তাদের বোধগম্য উপায়ে উপস্থাপন করে থাকেন। তাই এই ছবিগুলোকে সে অর্থে ছবি বলা যায় না।

পৃথিবী থেকে ৫৫ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরের এই ব্ল্যাকহোলের ছবি তোলা, পৃথিবী থেকে চাঁদের ওপর রাখা কমলার ছবি তোলার মতো। কিন্তু এত দূর থেকে ছবি তুলতে যে আকারের দূরবীণ দরকার, সে আকারের দূরবীন বানানো আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ সে রকম একটি দূরবীণের আকার হবে পৃথিবীর সমান!

এ সমস্যা সমাধানের জন্য বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় স্থাপিত ৮টি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন দূরবীণ ব্যবহার করেছেন। দূরবীণগুলো স্থাপন করা হয়েছে এমন জায়গায় যেখানে রাতের আঁধারে লোকালয়ের আলো পৌঁছে না। ফলশ্রুতিতে, মনুষ্যসৃষ্ট শহরের কৃত্রিম আলো বিজ্ঞানীদের ছবি তোলার পথে অন্তরায় হতে পারেনি। দূরবীণগুলো স্থাপন করা হয়েছে এমন সব জায়গায়, যেমন পাহাড়ের অনেক উঁচুতে, যেখানে জলীয়বাষ্পের উপস্থিতি খুব কম। ফলশ্রুতিতে, বায়ুমণ্ডলের জলীয়বাষ্প বহুদূরের দৃশ্য দেখার ক্ষেত্রে বড় ধরনের অন্তরায় হতে পারেনি।

পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে স্থাপন করা এই ৮টি টেলিস্কোপ থেকে রেডিও ওয়েভ তরঙ্গদৈর্ঘ্যে নিখুঁতভাবে একই সময়ে তোলা ছবিগুলো একসাথে করে ব্ল্যাকহোলের চূড়ান্ত একটি ছবি দাঁড় করানো হয়। এক্ষেত্রে পৃথিবীর ঘূর্ণন ছবির উচ্চ রেজলুশান পেতে সহায়তা করেছে। কারণ দূরবীণগুলো নিজেদের অবস্থানে স্থির থাকলেও পৃথিবীর ঘূর্ণনের ফলে, মহাবিশ্বের সাপেক্ষে, ১২ ঘণ্টায় পৃথিবীর ব্যাসের সমান দূরত্ব ভ্রমণ করেছে।

পৃথিবীর সাথে ঘুরতে ঘুরতে তাঁরা যে দূরত্ব অতিক্রম করেছে সেই পুরো পথে ছবি তুলতে থাকার ফলে শেষ পর্যন্ত এই ৮টি দূরবীণ মিলে পৃথিবীর সমান একটি ভার্চুয়াল দূরবীণের সৃষ্টি করেছে, ফলশ্রুতিতে ছবিগুলোর রেজলুশান বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু ছবিগুলো যেহেতু কনভেনশানাল ক্যামেরায় এক ক্লিকে তোলা কোনো ছবি নয়, বরং দীর্ঘ সময় ধরে সংগ্রহ করা অসংখ্য তথ্যের সমন্বয়ে গড়া রিকন্সট্রাক্ট, তাই ব্ল্যাকহোলের যে ছবিটি আমরা দেখতে পাচ্ছি, এটি আসলে আমরা ছবি বলতে যা বুঝি ঠিক তা নয়। অসংখ্য তথ্যের সমন্বয়ে গড়া ব্ল্যাকহোলটির রিকন্সট্রাকশান। তবে ব্ল্যাকহোলটির সত্যিকারের চিত্র বোঝার জন্য এটি পর্যাপ্ত ও যথেষ্ট।

সূত্র: Roar Media

আরও পড়ুন: আগুন আসলে কী?

Facebook Comments
পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন: