বিজ্ঞানিদের দুঃসাহসিক কাজ আর আমাদের সুখের জীবন

বিজ্ঞানিদের দুঃসাহসিক কাজ আর আমাদের সুখের জীবন
 

আমরা কত সহজে সব কিছু পেয়ে যাচ্ছি । কিছু টাকা খরচ করলেই সব সুবিধা আমাদের হাতের মুঠোয়। যারা এই সুবিধাগুলি আমাদের দিয়ে গেছেন তাদের কথা কি একবারের জন্যও স্বরণ করছি ?  তারা নিজ শরীরের উপর এক্সপেরিমেন্ট করে এক একটা জিনিস আবিষ্কার করে আমাদের জীবনকে সহজ করেছেন । তাদের জন্য তো আমরা কিছুই করছিনা অনেক সময় স্বীকারও করছিনা তাদের। আজ এমন কিছু বিজ্ঞানিদের দুঃসাহসিক কাজ বলতে যাচ্ছি যা জেনে আপনি ভাবতে বাধ্য হবেন।

ওয়ার্নার ফর্সম্যানওয়ার্নার ফর্সম্যান

১৯২৯ সালে ওয়ার্নার ফর্সম্যান ছিলেন একজন শিক্ষানবীশ সার্জন, যিনি একইসাথে হৃদপিণ্ডের ব্যাপারে জানতেও ব্যাপক আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু অন্যান্য মেনি-বিড়াল টাইপ সার্জনদের মত বই-পত্তর না ঘেঁটে, কিংবা মৃত প্রাণীর শরীর না হাতড়িয়ে তিনি আরো ক্লাসিক মেথডে চলে গেলেন। একটা বাচ্চা যেমন নতুন কিছু দেখলে গুঁতো দিয়ে সেটা সম্পর্কে বোঝার চেষ্টা করে, তিনিও তাই করলেন………এবং সরাসরি নিজের উপর!

অন্য কোনো এক্সপার্টের তত্ত্বাবধান, উপদেশ কিংবা আত্ম-রক্ষা জাতীয় কোন ব্যাকআপ প্ল্যান ছাড়াই তিনি সরাসরি নিজের হাত কেটে ছিদ্র করে তাতে ক্যাথেটার টিউব ঢুকিয়ে দিলেন। তারপর সেটা ঠেলতে ঠেলতে পুরো হাত পেরিয়ে হৃদপিণ্ড পর্যন্ত নিয়ে পৌঁছালেন।

একজন মহিলা নার্স তাকে একাজে সহায়তা করেছিলো, কারণ প্রয়োজনীয় সার্জিক্যাল যন্ত্রপাতি তার হাতে তুলে দেবার জন্যে কাউকে তার দরকার ছিলো। আমরা ধারণা করছি- অপারেশনের শুরুতেই তিনি ভয়ে কাঁপতে থাকা নার্সকে অপারেশন টেবিলে শোয়ালেন। তারপর তাকে একটা পেইন-কিলার ট্যাবলেট খাওয়ালেন। অতঃপর যখন নার্স প্রস্তুত হলো, তখন তিনি অপারেশন টেবিলের পাশে চেয়ারে বসে নিজের হাতে নিজেই অপারেশন করা শুরু করলেন। ফাঁকে ফাঁকে নার্স তাকে এটা সেটা এগিয়ে দিতে লাগলো যথাসম্ভব তার দিকে না তাকানোর চেষ্টা করে।

এই ঘটনার পর ওয়ার্নারকে ঐ হাসপাতাল থেকে বরখাস্ত করা হয়, কারণ তার এই বীরত্ব অন্যেরা ঠিক হজম করতে পারছিলো না। যদিও এই ঘটনার ২৭ বছর পরে, ১৯৫৬ সালে তিনি ‘কার্ডিয়াক ক্যাথেটারাইজেশন’-এর প্রক্রিয়া উদ্ভাবনের জন্যে চিকিৎসাবিদ্যায় নোবেল পুরষ্কার পেয়েছিলেন।

এলবার্ট হফম্যানেরএলবার্ট হফম্যানের

ডঃ এলবার্ট হফম্যান ১৯৩৮ সালে ‘লাইসের্জিক এসিড ডাই-ইথালএমাইড-২৫’ আবিষ্কার করেন। এর ৫ বছর পরে দুর্ঘটনাবশত এই ড্রাগের কিছুটা চামড়ার মাধ্যমে তার শরীরে প্রবেশ করে। ড্রাগের বিষক্রিয়ায় তিনি আবোল-তাবোল জিনিস চোখের সামনে দেখতে শুরু করেন। দুই ঘণ্টা পরে হুঁশ হলে তার প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিলো, “অসাম মামা! আমার এই জিনিস আরো চাই”।

তাই তিনি আর দেরি করলেন না। তিন দিন বাদে ২৫০ মাইক্রোগ্রাম (বর্তমানে যেটা সাধারণ ডোজের চেয়ে ১০ গুণ বেশি হিসাবে গণ্য) এলএসডি আবার শরীরে প্রবেশ করালেন। পরবর্তীতে তিনি স্বীকার করেছিলেন তার হিসাবে ভুল হয়েছিলো। আরো কম ডোজ নেয়া দরকার ছিলো। কারণ ঐ ডোজ নেয়ার পর বাকি পুরোদিন তিনি কী করেছিলেন পরিষ্কার মনে নেই। তার মুখ দিয়ে স্পষ্টভাবে কথা বের হচ্ছিলো না। তিনি শুধু কানে ভৌতিক শব্দই শুনছিলেন না- সেই শব্দ চোখে পরিষ্কার দেখছিলেনও! প্রেতাত্মারা তাকে ঘরের এমাথা-ওমাথা তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিলো। ঘরের ফার্নিচারগুলো সব তাকে মেরে ফেলতে চাইছিলো। এবং সর্বোপরি তিনি চোখের সামনে জীবনের সেরা আতশবাজির খেলা দেখতে পাচ্ছিলেন।

পরদিন তিনি তাই সিদ্ধান্ত নিলেন এই জিনিসের কথা পুরো বিশ্ববাসীকে জানাতে হবে। বাকী জীবন তিনি তাই এলএসডির চমৎকার সব গুণের কথা প্রচার করে যান। পরবর্তীতে অবশ্য পাঁড় নেশাখোরদের কারণে পুরো জিনিসটাই নিষিদ্ধ হয়ে যায় এবং বিশ্ববাসী এই ড্রাগের চমৎকারিত্বের স্বাদ থেকে বঞ্চিত হয়। (সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ- এলএসডি আসলেই মারাত্মক ক্ষতিকর ড্রাগ)!

ডঃ হফম্যানের এই উদ্ভাবিত বস্তু দর্শন, শিল্পকলার পাশাপাশি বিজ্ঞানের অন্যান্য ক্ষেত্রেও ব্যাপক অবদান রেখেছিলো। বলা হয়ে থাকে- প্রফেসর ক্রিক, যিনি ডিএনএ এর গঠন আবিষ্কার করার কারণে ইতিহাসে বিখ্যাত, স্বীকার করেছিলেন নাকি যে এলএসডি না হলে তিনি কখনোই ডিএনএর গঠন আবিষ্কার করতে সক্ষম হতেন না। এটা কতটুকু সত্যি, আর কতটুকু মিথ- তা প্রশ্নসাপেক্ষ। কিন্তু সেই সময় “একটা সিঁড়ি প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে উপরে শূন্যে উঠে গেছে, আর তার প্রত্যেকটা ধাপে মানুষের জীবনের তথ্যসমূহ রাসায়নিক ভাবে কোডিং করা আছে”- এইরকম একটা বস্তু চোখের সামনে দেখতে হলে এলএসডির যে কোনো বিকল্প নেই, সেটা পাগলেও বোঝে!

ডঃ ওয়ারেন এবং ডঃ ব্যারি মার্শাল

ডঃ ওয়ারেন এবং মার্শাল যখন সফলভাবে পাকস্থলী হতে আলসার সৃষ্টির জন্যে দায়ী Helicobacter pylori ব্যাকটেরিয়াগুলোকে আলাদা করতে সক্ষম হলেন, তখন তারা বিশ্বকে জানালেন এই মোস্ট ওয়ান্টেড ক্রিমিনাল ব্যাকটেরিয়ার কারণেই পেটের আলসার হয়। কিন্তু যথারীতি অধিকাংশ বিজ্ঞানী সমাজ এর প্রতিবাদ করলেন, আর বললেন- অসম্ভব। আলসার হয় দুশ্চিন্তা, মানসিক অশান্তি এবং অনিয়মিত জীবন যাপনের ফলে। তাই তখন ডঃ মার্শাল এই প্রতিবাদের জবাব দিলেন পুরো এক শিশি ভর্তি এই ব্যাকটেরিয়া গিলে ফেলে, যেগুলো তারা আলসারের রোগীদের পাকস্থলী হতে সংগ্রহ করেছিলেন।

পুরো শিশি গলাধঃকরণের আগ পর্যন্ত তিনি তার বিশ্বাসে স্থির ছিলেন। তার স্থির বিশ্বাস আরো ইস্পাত কঠিন হলো, যখন কিছুদিনের ভেতরেই তিনি গ্যাস্ট্রাইটিস এর সাথে সাথে এক্লোরহাইড্রিয়া, ক্রমাগত বমিভাব ইত্যাদি ইত্যাদিতে আক্রান্ত হলেন। পুরোপুরি সুপারহিরো মুভি স্টাইলে নিজের তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করায় নোবেল প্রাইজ কমিটি তার বীরত্বে চমৎকৃত হয়ে ডঃ মার্শাল এবং ডঃ ওয়ারেনকে ২০০৫ সালে নগদে হাতে নোবেল প্রাইজ ধরিয়ে দেয়।

 

 

Facebook Comments
পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন: