প্লাস্টিক আমাদের কীভাবে ক্ষতি করছে?

প্লাস্টিক আমাদের কীভাবে ক্ষতি করছে?
 

মানুষ সৃষ্টিকুলের সেরা জীব এবং আমরা বর্তমানে আধুনিক সমাজে বসবাস করছি। সেকেন্ডের মধ্যে পরিবর্তন চলে আসছে বিশ্বে। নতুন নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার সবাইকে তাক লাগিয়ে দিচ্ছে। অপর দিকে আমরা পরিবেশের যে ক্ষতি করছি এতে করে পরিবেশ আমাদের উপর চড়াও হলেও আমাদের কিছুই করার থাকবে না। আর প্লাস্টিক হলো পরিবেশকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিতে আমাদের সবচেয়ে বড় অবদান! এই লেখাতে আমরা দেখব, কীভাবে প্লাস্টিক দিয়ে আমরা পৃথিবীর পরিবেশকে ধ্বংস করে ফেলছি!

সমুদ্রে প্লাস্টিক

সমুদ্রে কী পরিমাণ প্লাস্টিক ভেসে যায় তা শুনলে হয়তো অবাকই হবেন। ২০১৫ সাল নাগাদ, পৃথিবীতে ৬.৩ বিলিয়ন প্লাস্টিক পণ্য তৈরি করা হয়েছে। ভয়ংকর হলেও সত্য যে, এর মাত্র ৯ শতাংশকে পুনরায় ব্যবহার করা হয়েছে, ১২ শতাংশ পুড়িয়ে নষ্ট করা হয়েছে আর বাকি ৭৯ শতাংশই পৃথিবীর প্রাকৃতিক পরিবেশে জমা আছে।

২০১০ সালের ১৯ এপ্রিল The Seattles Time (দ্যা সিটলস টাইম) নামক দৈনিকে একটি খবর খুব সাড়া দেয়। সীটল সমুদ্র সৈকতে মৃত পড়ে থাকতে দেখা যায় একটি বিশাল তিমিকে। পরে যখন সেই তিমির মৃত্যুর কারণ নিয়ে গবেষণা করা হয়, তখন দেখা যায় তিমির পাকস্থলিতে ছিল বহু প্লাস্টিক পদার্থ। সেসব প্লাস্টিককেই সেই তিমির মৃত্যুর কারণ হিসেবে গণ্য করা হয়।

এসব জলজ প্রাণির মৃত্যু কিন্তু মোটেও নতুন কিছু নয়। প্রায়শই আমরা সংবাদপত্রে দেখতে পাই এরকম সামুদ্রিক প্রাণির মৃত্যুর খবর। জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে একটি ভয়াবহ তথ্য তুলে ধরা হয়, যেখানে বলা হয়- প্রতি বছর প্রায় ৮০০ প্রজাতির সামুদ্রিক প্রাণি সমুদ্রযানের বর্জ্য পদার্থ দিয়ে আক্রান্ত হয়, আর এসবের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশই হচ্ছে প্লাস্টিক জাতীয় বর্জ্য, যা নিতান্তই আমাদের দায়বদ্ধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে।

এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, প্রায় অর্ধেক সামুদ্রিক কচ্ছপ প্রতিবছর প্লাস্টিক জাতীয় পদার্থ গলাধঃকরণ করছে, যে কারণে এদের অনেকেই মৃত্যুমুখে পতিত হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, প্লাস্টিকদ্রব্য তাদের প্রজননেও বাঁধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ফলশ্রুতিতে এই সামুদ্রিক কচ্ছপগুলোর অস্তিত্বই হুমকির ভেতরে পড়ে যাচ্ছে।

প্লাস্টিক আমাদের কীভাবে ক্ষতি করছে?

স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে প্লাস্টিকের ভূমিকা

প্লাস্টিক পুরো বিশ্বেই বহুল ব্যবহৃত একটি সামগ্রী। প্লাস্টিকের গামলা, বালতি, চায়ের কাপ, স্ট্র, পানির বোতল, কোমল পানীয়ের পাত্র ইত্যাদি রান্নাঘরের কোণ থেকে শুরু করে ঘর-গৃহস্থালির সব জায়গাতেই ব্যবহার হয়। এমনকি জুস কিংবা চা সরবরাহের জন্য হোটেলগুলোতে প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি পলিথিনের ব্যাগ ব্যবহার হয়ে থাকে।

বিশেষ করে ওয়ান-টাইম ইউজ প্লাস্টিক (বোতল, কাপ, প্লেট, বক্স, চামচ, স্ট্র) দ্রব্যের ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে। মাছ-মাংস, শাক-সবজি, ডাল, চিনি, রসগোল্লা ইত্যাদি খাদ্যদ্রব্য শোভা পাচ্ছে প্লাস্টিকের মোড়কে।

আকার ও ওজনে সুবিধাজনক হলেও প্লাস্টিকের বোতল স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। তা সত্ত্বেও প্লাস্টিকের বোতলে শুধু পানি, তেল, সস, বা জুস নয়, ওষুধ পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। অবস্থা দেখে মনে হয় যে, এটা প্লাস্টিকের যুগ। শুধু শহরেই নয়, গ্রামগঞ্জেও এ অবস্থা দৃশ্যমান।

এটি খাবার থেকে শরীরের ভেতরে প্রবেশ করে। শুধু তাই নয়, প্লাস্টিকের পাত্রে খাবার গরম করলে ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান বের হয়ে খাবারের মধ্যে প্রবেশ করে। এর ফলে ক্রমাগত বাড়ছে ক্যান্সার, অ্যাজমা, অটিজম, হরমোনজনিত সমস্যা, গর্ভপাতসহ নানা জটিল রোগ।

প্লাস্টিক এ থাকা ক্ষতিকর রাসায়নিক:

বিসফেনল A(BPA)

অধিকাংশ প্লাস্টিক বোতলে থাকে। অন্তঃসত্ত্বা মহিলার শরীরে এই যৌগ ঢুকলে শিশুর ওজন হ্রাসের আশঙ্কা থাকে। শরীরে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে। শিশুর মহিষ্কের বিকাশ রোধ করে।

পলিইথিলিন টেরেফটালেট (PET)

প্লাস্টিক বোতলে থাকে। এর থেকে অ্যান্টিমনি নিঃসৃত হয়। যা পেটের অসুখ ও পাকস্থলিতে ক্ষত সৃষ্টি করে। স্ত্রী হরমোনের পরিমাণ ও লক্ষণ বাড়ায়। পুরুষ হরমোন নিঃসরণ কমায়।

হাই ডেনসিটি পলিইথিলিন(HDPE)

দুধের বোতল, প্রসাধনী কনটেইনার, পলিপ্যাকে থাকে। এতে স্ত্রী হরমোনের নিঃসরণ ও লক্ষণ বেড়ে যায়। হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়। শিশু শরীরে কোষের গঠন বদলে দেয়।

পলিভিনাইল ক্লোরাইড(PCV)

মাংসের র‍্যাপার, বেডিংয়ের কভার, টেবল ক্লথে থাকে। এতে শিশুদের হাঁপানি হতে পারে। কমতে পারে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। মহিলাদের বন্ধ্যাত্ব আসতে পারে।

পলিস্টাইরিন(PS)

কাপ, প্লেট, বাটি, ট্রে-এসবে থাকে। এর থেকে স্টাইরিন যৌগ নিঃসৃত হয়। যার প্রভাবে রক্তের ক্যানসারের আশঙ্কা থাকে। লিভার, কিডনি ও পাকস্থলির ক্ষতি হতে পারে।

পাখিদের উপর প্লাস্টিক দ্রব্যের প্রভাব

গবেষণায় দেখা গিয়েছে, প্রতিবছর প্রায় ১০ লাখ পাখি প্লাস্টিক দূষণের শিকার হচ্ছে। এখনই এসব পরিযায়ী পাখির প্রায় ৯০% এর পাকস্থলিতেই পাওয়া যাচ্ছে প্লাস্টিক জাতীয় দ্রব্য। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৫০ সাল নাগাদ এ সংখ্যা দাঁড়াবে ৯৯% এ, যা এসব পাখির অস্তিত্বের পথে বিরাট বড় এক বাঁধা। এ পাখিরা বাঁচার জন্য সামুদ্রিক প্রাণিদের খেয়ে থাকে। যেহেতু সমুদ্রে প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণ অত্যাধিক হারে বেড়ে যাচ্ছে, তাই সেসব সামুদ্রিক প্রাণি গ্রহণের সাথে সাথে সেসব পাখির পাকস্থলিতেও চলে যাচ্ছে প্লাস্টিক পদার্থগুলো।

বাংলাদেশের পরিবেশ দূষণে প্লাস্টিক দ্রব্যের প্রভাব

বাংলাদেশেই এমনিতেই অনেক জনসংখ্যা। এই বিপুল জনসংখ্যায় সব কিছুর মতো প্লাস্টিকের  ব্যবহারও বেশি। ড্রেন থেকে শুরু করে খাল বিল পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে প্লাস্টিক। এককালে ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদী ছিল আমাদের গর্ব। কিন্তু এখন আমরা সেই নদীর কাছেই যেতে পারি না।  এসব নদী দূষণে একটি মূল ভূমিকা পালন করে প্লাস্টিক দ্রব্য। যেহেতু প্লাস্টিক জাতীয় দ্রব্য সহজে বিযোজিত হয় না, তাই এগুলো নদীর নিচে গিয়ে জায়গা ধারণ করে, ফলে নদীর পানির উচ্চতা হ্রাস পায়।

দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি

প্লাস্টিক জাতীয় পদার্থগুলো তৈরি করা হয় জীবাশ্ম জ্বালানী, যেমন- তেল বা প্রাকৃতিক গ্যাসকে ব্যবহার করে। আমরা যখন তেল বা খনিজ পদার্থ ভূ-ত্বক হতে নিষ্কাশন করি, তখন বিপুল পরিমাণ দূষিত পদার্থের নির্গমন ঘটে। এসব পদার্থের ভেতর উল্লেখযোগ্য হলো কার্বন মনোক্সাইড, কার্বন ডাই অক্সাইড, বেনজিন এবং মিথেন। এসব পদার্থ গ্রিনহাউস প্রক্রিয়ার জন্য দায়ী।

গ্রিনহাউস প্রক্রিয়ার ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়ে যায়, যে কারণে হিমালয়ের বরফ গলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাচ্ছে। ফলশ্রুতিতে অদূর ভবিষ্যতে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে নিচে অবস্থানরত দেশগুলোর প্রায় অনেক অঞ্চলই সমুদ্রের তলদেশে চলে যাবে। প্লাস্টিক পদার্থ কীভাবে এখানে ভূমিকা রাখবে তা একটি ছোট্ট উদাহরণ দিলে বোঝা যাবে। আমরা যে প্লাস্টিক বোতলগুলো ব্যবহার করে থাকি সেগুলোর মূল উপাদান পলিইথিলিন। একটি গবেষণায় দেখা যায়, এক আউন্স পরিমাণ পলিইথিলিন প্রস্তুত করলেই প্রায় ৫ আউন্স পরিমাণ কার্বন ডাইঅক্সাইড বায়ুতে নির্গত হয়। এর মানে দাঁড়ায়- আমরা যতটুকু প্লাস্টিকদ্রব্য তৈরি করছি তার থেকে বেশি পরিমাণ দূষিত পদার্থ বায়ুতে নির্গমন করছি। শিল্পোন্নত দেশগুলোতে বাজারজাতকরণের জন্য প্লাস্টিকের চাহিদা ব্যাপক। তাহলে ভাবুন তো, শিল্পায়নের নামে কী পরিমাণ পরিবেশ দূষণ চলছে উন্নত দেশগুলোতে?

সূত্র:

আরও পড়ুন: ব্ল্যাক হোল রহস্য

Facebook Comments
পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন: