প্যারাসিটামল এর নাড়ী-নক্ষত্র

প্যারাসিটামল এর নাড়ী-নক্ষত্র
 

ঠিক এই মুহুর্তে আপনি যদি বলেন ।  জ্বর জ্বর লাগছে তবে পাশে থাকা মানুষটি আপনাকে বলবে “একটা নাপা খা” । নাপা হচ্ছে প্যারাসিটামল এর বাণিজ্যিক নাম। জ্বর মাথা ব্যথায় বাঙ্গালির সার্ভিস দিয়ে যাচ্ছে। আসলে আমরা এটা কেন খাচ্ছি তা কি ভেবে দেখেছেন ? বা কোথা থেকে এলো এটা ।

প্যারাসিটামল
                                 Quinine

প্রাচীন এবং মধ্যযুগে জ্বর এবং ব্যথা সারানোর জন্য সাদা উইলো এবং সিনকোনা গাছের বাকল ব্যবহৃত হত। সাদা উইলো গাছ স্যালিক্স এলবা নামে পরিচিত, সে গাছের বাকলে salicin নামক রাসায়নিক পর্দাথ আছে যেটা রাসায়নিক ভাবে acetylsalicylic acid অর্থাৎ aspirin এর মত।সিনকোনা উদ্ভিদ যা সাধারণভাবে কুইনা নামেই পরিচিত। এই কুইনা উদ্ভিদ থেকেই ম্যালেরিয়ার ঔষুধ Quinine তৈরি করা হয়েছে। এটা ও জ্বর কমানোর জন্য ব্যবহৃত হত।

১৮৮০ সালের দিকে সিনকোনা গাছটি যখন প্রায় দুর্লভ হয়ে পড়ে তখন বিজ্ঞানীরা তার বিকল্প হিসেবে অন্য কিছু খুজতে থাকেন। ফলশ্রুতিতে ১৮৮৬ সালে acetanilide এবং ১৮৮৭ সালে phenacetin নামে দুটি বিকল্প রাসায়নিক যৌগ পেয়ে যান উনারা। aspirin এর পাশাপাশি এ দুটো যৌগ ব্যথা এবং জ্বরে ব্যবহৃত হত।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল, এসব ব্যথার ঔষুধ আবিষ্কারের আগেই ১৮৭৩ সালে প্যারাসিটামল আবিষ্কার হয়ে যায়। আমেরিকান বিজ্ঞানী হরমোন নোর্থরোপ মোরসে p-nitrophenol এবং tin in glacial acetic acid এর মধ্যে বিজারণ বিক্রিয়া ঘটিয়ে অ্যাসিটামিনোফেন অর্থাৎ প্যারাসিটামল তৈরি করে ফেলেন। এটা যে ঔষুধ হিসেবে কাজ করবে সেটা তিনি বুঝতেই পারেননি। দুংখের ব্যাপার হল জীবিত অবস্থায় তিনি সেটিকে আর ঔষুধ হিসেবে দেখে যেতে পারেননি।

তার দুই দশক পড়ে অর্থাৎ১৮৯৩ সালে আরেকটি মজার কাহিনী ঘটে। এটা ঘটেছিল University of Strassburg এ। এ ইউনিভার্সিটির ইন্টারনাল মেডিসিনের প্রফেসর এডলফ কুসমল ( Kussmaul breathing, Kussmaul’s sign,Kussmaul disease তিনিই ব্যাখ্যা করেন) তার দুই ছাত্র আরনোল্ড কাহন এবং পল হেপ কে ন্যাপথালিনের বোতল দিয়েছিলেন কিছু রোগীর অন্ত্রের কৃমি চিকিৎসা করার জন্য। কিন্তু উনারা দেখলেন যে কৃমি না মরে সে সব রোগীদের জ্বর কমে গেছে। তখন ন্যাপথালিনের বোতলটি ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হল। দেখা গেল সেই বোতলে যে রাসায়নিক যৌগটি ছিল সেটি হল acetanilide। সাথে সাথে ঐ রোগীদের প্রশ্রাব পরীক্ষা করেন উনারা। পরীক্ষায় প্রশ্রাবের মধ্যে সাদা, ক্রিস্টাল এবং খুব তিক্ত স্বাদ বিশিষ্ট একটি রাসায়নিক পর্দাথ পাওয়া গেল এবং সেটি ছিল প্যারাসিটামল। যে সব রোগীদের phenacetin দেওয়া হত তাদের প্রশ্রাবে ও একই পাওয়া পর্দাথ পাওয়া গেল। ১৮৯৯ সালের দিকে acetanilide এর বিপাক ক্রিয়ার ফলে উপজাত হিসেবে মানব দেহে প্যারাসিটামল পাওয়া গেল। কিন্তু সে সময়ে ও এর গুরুত্ত বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেননি।

মাঝখানে অনেক গুলো বছর কেটে গেল। প্যারাসিটামল নিয়ে আর তেমন কোন গবেষণা হয়নি। ১৯৪০ সালের দিকে aspirin ছাড়া অন্য গ্রুপের ব্যথার ঔষুধ ব্যবহারকারী রোগীদের রক্তে methemoglobinemia ( রক্তের অক্সিজেন বহন ক্ষমতা কমে যাওয়া) নামক মারাত্মক রোগ অহরহ পাওয়া যেতে লাগল। সে জন্য ১৯৪৬ সালে ” The Institute for the Study of Analgesic and Sedative Drugs” নামক সংস্থাটি ব্যথার জন্য ব্যবহৃত ঔষুধ ( analgesic) মানবদেহে কি কি সমস্যা করে সে গুলো নিয়ে গবেষণা করার জন্য ” New York City Department of Health কে একটি প্রজেক্ট দেয়। সে প্রজেক্টের প্রধান ছিলেন বিখ্যাত মার্কিন রসায়নবিদ বার্নাড ব্রোডি, তার অধীনে ছিলেন আরেক বিখ্যাত মার্কিন রসায়নবিদ জুলিয়াস অ্যাক্সেলরড। তারা নিউইয়র্ক এর গোল্ড ওয়াটার মেমোরিয়াল হাসপাতালে তাদের প্রজেক্ট শুরু করেন।

১৯৪৮ সালে উনারা দুজনই দেখতে পেলেন, ব্যথার জন্য ব্যবহৃত acetanilide এবং phenacetin নামক ড্রাগের সাথে methemoglobinemia নামক রক্তের সেই সমস্যার একটা যোগ সূত্র আছে এবং এদের পুরো উপাদানটি ব্যথার জন্য কাজ করে না। বরংতাদের বিপাক ক্রিয়ার ফলে যে উপজাত তৈরি হয় অর্থাৎ প্যারাসিটামল সেটা শুধু ব্যথার জন্য কাজ করে। উনারা তখন রোগীদের উপর গবেষণা শুরু করেন এবং দেখলেন যে শুধু প্যারাসিটামল ব্যবহারকারী রোগীদের রক্তে methemoglobinemia নামক সেই রোগটি আর হচ্ছে না।

১৯৫০ সালে আমেরিকায় প্রথম Triagesic নামে প্যারাসিটামল, এসপিরিন এবং ক্যাফেইনের কম্বিনেশন বাজারে ছাড়া হয়। কিন্তু দেখা গেল, এ ঔষুধের জন্য agranulocytoses ( হঠাৎ রক্তে শ্বেত রক্তকণিকা কমে যাওয়া) নামক অসুখটি হয়। বাধ্য হয়ে কতৃপক্ষ তখন বাজার থেকে এটি সরিয়ে ফেলেন।

১৯৫৫ সালে আমেরিকাতে সর্বপ্রথম Tylenol নামে প্যারাসিটামল বানিজ্যিক ভাবে বাজারে ছাড়া হয়। ১৯৫৬ সালে Panadol নামে ইংল্যান্ডের বাজারে আসে।বাজারে যখন আসে তখন প্যারাসিটেমলের স্লোগান ছিল ‘ “gentle to the stomach,” যেহেতু aspirin কে বলা হত ” irritant to stomach”. কাজেই তখন প্যারাসিটামল বেশি ব্যবহার হওয়া শুরু হল। ১৯৫৮ সালের জুন মাসে Panadol Elixir নামে বাচ্চাদের জন্য ফর্মুলা করে বাজারে ছাড়া হয়। ১৯৬৩ সালে এটাকে British Pharmacopoeia তে যোগ করা হয়। সেই থেকে আজ ও পর্যন্ত ব্যথা এবং জ্বরের ঔষুধ হিসেবে সবার আগে প্যারাসিটামলই ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

কিছু কথাঃ 

প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ৫০০ মিলিগ্রামের ট্যাবলেট একটি, কখনো প্রয়োজনে দুটি। ২৪ ঘণ্টায় তিন-চারবার খাওয়াই নির্দিষ্ট ডোজ। কিন্তু ২৪ ঘণ্টায় চার গ্রাম বা ৪০০০ মিলিগ্রামের বেশি খাওয়া যাবে না।

শিশুদের ক্ষেত্রে বয়স ওজন অনুযায়ী প্যারাসিটামল সিরাপ দিতে হবে। চার গ্রাম হচ্ছে সর্বোচ্চ মাত্রা।

ব্যথা বা জ্বরের জন্য তিন দিন পর্যন্ত প্যারাসিটামল খেতে পারেন। এতে উপকার না পেলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

প্যারাসিটামলের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সাধারণত গুরুতর নয়। দু-একটা ক্ষেত্রে রক্তের প্রয়োজনীয় উপাদানগুলোর অভাব সৃষ্টি বা চামড়ায় ফুস্কুড়ি দেখা গেছে।

উল্লিখিত পরিমাণের চেয়ে বেশি প্যারাসিটামল গ্রহণ করা উচিত নয়। বেশি গ্রহণ করলে কিডনি ও লিভারের ক্ষতির ঝুঁকি থাকে।

অনেকেই ২৪ ঘণ্টায় ১০-১২টি ৫০০ মিলিগ্রামের প্যারাসিটামল খেয়ে থাকে। এটি মোটেও ঠিক নয়। মোট চার গ্রাম হচ্ছে ৫০০ মিলিগ্রামের আটটি ট্যাবলেট, এটি হচ্ছে সর্বোচ্চ নির্ধারিত মাত্রা।

লিভারের সমস্যা থাকলে আরও কম মাত্রা গ্রহণ করতে হবে।

References:
1. Wikipedia
2. www. bimsifram.fr
3. www.herbal-supplement-resource.com
4. www.world medicinehistory.com
5. www. ch.ic.ac.uk

6. platfrom

আরো পড়ুনঃ কনডম আবিষ্কার হয় যেভাবে!

Facebook Comments
পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন: