পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ কীভাবে জন্মেছিল? | ভূ-তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ কীভাবে জন্মেছিল? | ভূ-তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

আপনারা কি জানেন পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ বলা হয় কোনটিকে? কীভাবে সৃষ্টি হয়েছিল সেই ব-দ্বীপ? আজকের লেখায় আমরা সংক্ষেপে সেই গল্প জানার চেষ্টা করব! চলুন তাহলে শুরু করা যাক!

শুরুতে পৃথিবীর ভেতরকার গল্প:

আমাদের পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ ভাগ জলন্ত এবং গলিত লাভার কারণে অনেক উত্তপ্ত। এর প্রধান কারণ হলো যখন বিগ ব্যাংয়ের মাধ্যমে আমাদের নক্ষত্র সূর্য এবং তার অন্যান্য গ্রহ উপগ্রহ তৈরি হয়েছিল, তখন সেগুলো অনেকটা উত্তপ্ত আগুনের গোলা-ই ছিল। এমনকি আমাদের পৃথিবীও এক সময় ছিল আগুনের গোলা!  এরপর আস্তে আস্তে এর উপরিভাগ ঠাণ্ডা- শীতল হতে শুরু করে! এরপর শীতল ও শক্ত হয়ে কঠিন ভূ-তলের সৃষ্টি করে, কিন্তু এর অভ্যন্তরে আটকে পড়ে উত্তপ্ত গলিত পদার্থ। সেসব গলিত পদার্থকে আমরা লাভা নামে চিনি। লাভার মধ্যে যেসব পদার্থ আছে, বিশেষ করে তেজস্ক্রিয় মৌলিক পদার্থগুলোর তাপ বিকিরণের ফলে এসব লাভা ভূ-অভ্যন্তরে স্রোতের সৃষ্টি করে। আর এই স্রোতের সংঘর্ষতেই পৃথিবীর উপরের ভূ-ত্বক যেসব প্লেটের (টেকটোনিক প্লেট) উপর অবস্থিত সেসব প্লেটগুলো চলতে শুরু করে। উল্লেখ্য যে, আমাদের এই পুরো পৃথিবীর ভূখণ্ড গুলো কিছু টেকটোনিক প্লেটের উপর অবস্থিত। আর এসব টেকটোনিক প্লেটগুলো প্রতিনিয়ত চলমান। শুনতে অবাক লাগলেও, এটাই সত্য যে- অভ্যন্তরীণ ফুটন্ত লাভার স্রোতে আমাদের পৃথিবীর সমস্ত ভূমি, পাহাড়-পর্বত, নদী-সমুদ্রসহ, সকল দেশ-মহাদেশ ভেসে বেড়াচ্ছে। তবে খুব ধীরে ধীরে। টেকটোনিক প্লেটগুলোর এই ভেসে বেড়ানোর অভ্যাস, পৃথিবীর মানচিত্র পর্যন্ত পরিবর্তন করে ফেলে। [উল্লেখ্য কোটি কোটি বছর আগে, আমেরিকা মহাদেশ ও আফ্রিকা মহাদেশ একত্রিত ছিল! ভূ-প্লেটের স্থানচ্যূতির কারণেই এগুলো আলাদা হয়ে গিয়েছিল।]

কীভাবে জন্মেছিল পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ?

যাই হোক, আজ থেকে প্রায় সাড়ে বারো কোটি বছর আগেকার কথা। ক্রিটেসিয়াস যুগের পূর্বে (সাড়ে বারো কোটি বছর আগে) বাংলাদেশের অংশবিশেষ সহ (বৃহত্তর রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চল) ভারতীয় প্লেট- অ্যান্টার্কটিকা, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকার সঙ্গে যুক্ত থেকে গন্ডোয়ানাল্যান্ড নামে একটি বৃহৎ মহাদেশ গড়ে তুলেছিল। বাংলাদেশের অবশিষ্টাংশের তখন অস্তিত্বই ছিল না। অতঃপর গন্ডোয়ানাল্যান্ডে ফাটলের ফলে ভারতীয় প্লেটের উত্তরমুখী সঞ্চরণ হতে থাকে এবং সর্বশেষে এশীয় (ইউরেশীয়) প্লেটের সঙ্গে এর সংঘর্ষের ফলে হিমালয় পর্বতমালা ও বাংলাদেশের বদ্বীপীয় সমভূমির সৃষ্টি শুরু হয়।

এখানে বলা রাখা প্রয়োজন যে, সাধারণত ২টা প্লেটের সংঘর্ষে ৩ ধরনের ঘটনা ঘটে:

  • আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত
  • ভূমিকম্প
  • মুখোমুখি ২টা প্লেটের সংঘর্ষে একটার আরেকটার উপর চাপের ফলে মাঝের মাটি উপর দিকে উঠে পাহাড়-পর্বত সৃষ্টি হওয়া

তো, সেভাবেই ভারত ও ইউরেশীয় টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষেই গড়ে ওঠেছিল হিমালয়, অন্নপূর্ণা সহ কতিপয় পৃথিবী বিখ্যাত পর্বত সমূহ।

ভারতীয় প্লেট ও এশীয় (ইউরেশীয়) প্লেটের মধ্যে পর্যায়ক্রমিক সংঘর্ষ ইয়োসিন যুগে (অর্থাৎ ৫ কোটি থেকে সাড়ে ৫ কোটি বছর আগে) অর্থাৎ হিমালয় পর্বত তৈরী শুরুর সময় প্রথম সংঘটিত হয়। নবীন ইয়োসিন যুগে (অর্থাৎ সাড়ে তিনকোটি থেকে ৪ কোটি বছর আগে) ভারতীয় প্লেট ও এশীয় প্লেটের মধ্যবর্তী টেথিস সাগরের সর্বশেষ চিহ্ন সম্ভবত বিলীন হয়ে গিয়েছিল। এই সময়েই ভারতীয় প্লেটের অভিসরণ দিক দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার সঙ্গে ক্রমবর্ধমান সংঘর্ষসহ উত্তর থেকে উত্তর পূর্ব দিকে পরিবর্তিত হয়ে যেতে থাকে। ওলিগোসিন যুগ থেকেও (অর্থাৎ সাড়ে তিনকোটি বছর আগে) প্লেট সংঘর্ষ অব্যাহত থাকে এবং বিশাল নদীমালার জলরাশিতে দক্ষিণে আদি বঙ্গীয় অববাহিকা ভরে উঠে। এরপর উত্থিত হিমালয়ের অবক্ষেপ নেমে আসতে শুরু করে এ অঞ্চলে। মায়োসিন পরবর্তী সময় থেকে (অর্থাৎ আড়াই কোটি বছর আগে ও তৎপরবর্তী) অববাহিকায় দ্রুত অবনমনের সঙ্গে হিমালয় পবর্তমালার দ্রুত উত্থানের ফলে বিপুল অবক্ষেপের সুতপের পাশাপাশি বৃহদাকৃতির বদ্বীপ গড়ে উঠা শুরু করে। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র বদ্বীপ নামের এই সুবৃহৎ বদ্বীপের গঠন প্রক্রিয়া আজও অব্যাহত আছে। আর এটিই এখনো পর্যন্ত পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ হিসেবে হিসেবে স্বীকৃত; যেখানে আমরা বসবাস করছি এবং যেটাকে আমরা চিনি নিজের দেশ-নিজের মাতৃভূমি বাংলাদেশ হিসেবে।

উল্লেখ্য যে, পৃথিবীর সকল টেকটোনিক প্লেট-ই চলাচল করে কিন্তু তাদের গতি খুবই কম। কিন্তু সে তুলনায় ভারতীয় প্লেটের গতি ছিল অনেক বেশি। এই কারণেই তার এত বড় পরিবর্তন এসেছে বলে ধারণা করা হয়। এ ছাড়া দুটি ভিন্ন এলাকার প্লেট একত্রিত হয়ে পশু-পাখি, উদ্ভিদ এমনকি আবহাওয়াতেও মিথস্ক্রিয়া ঘটিয়ে বিশাল পরিবর্তন আনতে পারে। এজন্যই সম্ভবত আমরা ভারত উপমহাদেশে আবহাওয়ায় এবং প্রাণি-উদ্ভিদকূলে এত বৈচিত্র্য দেখতে পাই! আবহাওয়ার পরিবর্তন আসার আরেকটি কারণ অবশ্য এসব সুউচ্চ পর্বতমালা। কারণ উঁচু পর্বতমালায় মেঘ আটকে যায়। তাই এসব অঞ্চলে মৌসুমি বায়ুর প্রভাবও দেখা দেয়। মেঘ জমার ফলে প্রচুর বৃষ্টিপাত ও বর্ষার সৃষ্টি হয়। আবার বৃষ্টির ফলে পর্বত থেকে নেমে আসা জল থেকে তৈরী হয় অসংখ্য ঝরনা ও নদী। এরা পানির সাথে সাথে বয়ে নিয়ে আসে প্রচুর পলিমাটি। মূলত হাজার বছর ধরে বয়ে আনা এই পলিমাটিই সৃষ্টি করেছিল এই ব-দ্বীপ অঞ্চলের। যেখানে পরবর্তীতে বাংলাদেশের ভূ-খণ্ডেরও জন্ম।

এদিকে ভারতীয় প্লেট ও এশীয় প্লেটের সংঘর্ষ এখনো থামেনি, এখনো চলমান! আর সেই সংঘর্ষের ফলে হিমালয়ের উচ্চতা এখনো বেড়েই চলছে।

পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ কোনটি?

পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ হলো বাংলাদেশ। ভূমির আকৃতি ও প্রকৃতির কারণে কোনো একটি অঞ্চলকে মূলত ব-দ্বীপ বলা হয়ে থাকে। বাংলা 'ব' অক্ষরের আকৃতি অথবা গ্রিক বড় হাতের অক্ষর ডেল্টা এর আকৃতি বিশিষ্ট ভূখণ্ডকে ব-দ্বীপ বলা হয়। এই পৃথিবীতে যতগুলো ব-দ্বীপ রয়েছে তার মধ্যে বৃহত্তম হলো বাংলাদেশ। আর তাই বাংলাদেশকে পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ বলা হয়।

বাংলাদেশের বৃহত্তম ব-দ্বীপ কোনটি?

বাংলাদেশের বৃহত্তম ব-দ্বীপ হলো সুন্দরবন অঞ্চল। আয়তনের বিশালতার কারণেই সুন্দরবন বাংলাদেশের বৃহত্তম ব-দ্বীপ হিসেবে পরিচিত। এ ছাড়া পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন হিসেবেও পরিচিত সুন্দরবন।

পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপের নাম কি?

পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপের নাম হলো বাংলাদেশ। ভূমির আকৃতি ও প্রকৃতির কারণে কোনো একটি অঞ্চলকে ব-দ্বীপ বলা হয়ে থাকে। বাংলা 'ব' অক্ষরের আকৃতি অথবা গ্রিক বড় হাতের অক্ষর ডেল্টা এর আকৃতি বিশিষ্ট ভূখণ্ডকে মূলত ব-দ্বীপ বলা হয়। পৃথিবীতে যতগুলো ব-দ্বীপ রয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো বাংলাদেশ।

পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ কীভাবে জন্মেছিল?

পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ হলো বাংলাদেশ। মূলত ভারতীয় টেকটোনিক প্লেট ও এশীয় টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষের ফলে সৃষ্টি হয়েছিল হিমালয় পর্বতমালার। আর হিমালয় থেকে বিভিন্ন নদীর বয়ে আনা পলিমাটি হাজার হাজার বছর ধরে জমতে জমতে সৃষ্টি করেছিল এই ব-দ্বীপ অঞ্চল অর্থাৎ বাংলাদেশের।

পাঠকের মন্তব্য:
পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন: