পৃথিবীর জন্য উপহারঃ নিকোলা টেসলা

পৃথিবীর জন্য উপহারঃ নিকোলা টেসলা
 

আমরা অনেক সময় বলে থাকি One Man Army । সেইদিক থেকে নিকোলা টেসলা হলেন One Man Army। সে প্রায় ৩০০ টির বেশি আবিষ্কারের প্যাটেন্ট দিয়েছিলেন এবং তাঁর আবিষ্কার গুলো ছিল সময়কে ছাপিয়ে গিয়ে,  সে সময় থেকেও অনেক অনেক আধুনিক যা বর্তমান যুগেও আধুনিক হিসাবে বিবেচিত হয়। নিকোলা টেসলাকে বলা হয় আধুনিক সময়ের ‘দ্য ভিঞ্চি’। তিনি এমন বিজ্ঞানি ছিলেন যখন তার যা মনে হয়েছে তাই করে দেখিয়েছেন । অনেকে তাকে পাগলা বিজ্ঞানিও বলেন । কিন্তু আধুনিক বিশ্ব তার অবদান কোনদিন ভুলবেনা ।

পরিবার চেয়েছিল সে ধর্মযাজক হোক তবে পৃথিবী তা চায়নি । কারণ সে বিজ্ঞানের বরপুত্র । তাকে ধর্মযাজক এর দীক্ষা নিতে পাঠানোও হয়েছিল কিন্তু তিনি কলেরায় আক্রান্ত হন আর সেখান থেকে চলে আসেন। তাকে ইঞ্জিনিয়ার বানানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময়ে এক শিক্ষকের সাথে তার কোন একটা বিষয় নিয়ে দ্বিমত হয়। পরে সে প্রতিদিন ১৮ ঘণ্টা ল্যাব কাজ করে প্রমান করেন যে তার ধারনাই সঠিক। এই ঘটনা কলেজে ছড়িয়ে পড়লে তিনি সকলের কাছেই আরও বেশি বিস্ময়কর ছাত্র হয়ে ওঠেন। তখন ও তার বিস্ময়কর আবিস্কার শুরু হয়নি।

১৮৮৪  সালে Nikola Tesla আমেরিকায় পাড়ি জমান। সাথে ছিল ৪ টি কাপড় আর শুধু পরিচয়পত্র আর সাথে Thomas Edison কে লিখা একজনের একটা চিঠি যেটা নিকোলা টেসলা কে বলা হয়েছিল Thomas Edison কে পৌঁছে দিতে। সেই চিঠিটাতে লিখা ছিল:  আমি পৃথিবীতে দুইজন জ্ঞানী লোককে চিনি, একটা তুমি (Edison) এবং অপরটি তোমার সামনে দাঁড়ানো Nikola Tesla!

১০ জুলাই ১৮৫৬ সালে তৎকালীন সার্বিয়ায় (বর্তমান ক্রোয়েশিয়ায়স্মিলিজান শহরে। পিতা মিলুতিন টেসলা একজন ধর্মযাজক এবং মা ডুকা টেসলা ছিলেন একজন উদ্ভাবক। নিকোলা টেসলার মায়ের বেশ নাম ডাক ছিল বিভিন্ন ঘরোয়া যন্ত্রপাতি এবং মেশিন তৈরির জন্য। বলা হয় নিকোলা টেসলা যখন পৃথিবীতে আসেন সেদিন নাকি প্রচন্ড বজ্র সহ ঝড় হচ্ছিল। দাই বলেছিলেন, এই ছেলে অন্ধকার নিয়ে এলো কিন্তু নিকোলা টেসলার মা বলেছিলেন- আমার এই সন্তান পৃথিবীতে আলো নিয়ে আসবে। মায়ের কথা তিনি সত্য প্রমাণ করে সারা বিশ্বকে দেখিয়েছিলেন। তার আবিষ্কার দিয়েই সারা পৃথিবী এখন আলোকিত।

ছোটবেলা থেকেই টেসলা ছিলেন প্রচন্ড মেধাবী। তিনি মাথার ভেতরে ক্যালকুলাস করে ফেলতে পারতেন বলে স্কুলে শিক্ষকরা ধরেই নিয়েছিলেন যে, তিনি হয়তো পরীক্ষায় নকল করছেনকিন্তু আদতে জন্মসূত্রে তিনি পেয়েছিলেন অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা। তার ছিল ফটোগ্রাফিক মেমোরিএই ক্ষমতা দিয়ে তিনি বই মুখস্ত করে ফেলতেন অনায়াসে। এছাড়া মাথার ভেতরে ক্যালকুলাস ছাড়াও তিনি মাথার মাঝে যে কোনো গঠন বা স্ট্রাকচার কল্পনা করতে পারতেন। এজন্যই হয়তো তার গবেষণা পত্রে ছবি পাওয়া যায়নি তেমন।

বৈদ্যুতিক বাতি আবিষ্কার এর নাম হিসেবে আমরা থমাস আলভা এডিসন এর নামই শুনে থাকি। তবে তার গবেষণা ছিল নাম মাত্র , রিয়েল হিরো নিকোলা টেসলা।

১৮৮৪ সালে নিকোলা টেসলা টমাস আলভা এডিসনের কোম্পানিতে চাকুরী নেন। সেইসময় তিনি এডিসনকে বলেন যে এডিসনের ফ্লুরোসেন্ট বাতি নিয়ে বৈদ্যুতিক গবেষণার কাজ অনেক তাড়াতাড়ি এবং আরও কম খরচে তিনি শেষ করতে পারবেন। এডিসন প্রস্তাব দেন যদি টেসলা এটা করতে পারে তবে তাকে ৫০,০০০ ডলার পুরষ্কার দেয়া হবে।  এরপর টেসলা প্রচুর পরিশ্রম করলেন আর ফ্লুরোসেন্ট বাতিকে আমরা বর্তমানে যেভাবে চিনি সেভাবে রূপদান করলেন। তারপর যখন এডিসনের কাছে তার প্রাপ্য পুরষ্কার চাইতে গেলেন এডিসন তখন বেশ একচোট হেসে পাক্কা ভিলেনের মত বললেন, “লুলজ! আপনি তো দেখি আমেরিকান রসিকতাও বুঝেন না।”

টেসলা তখন ক্ষেপে গিয়ে এডিসন কোম্পানির চাকুরী ছেড়ে দেন। এই সুযোগে তাকে লুফে নেয় এডিসনের প্রতিদ্বন্দ্বী ‘ওয়েস্টিংহাউজ ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানী‘ (নামটা খেয়াল রাখুন)। কিছুদিনের ভেতরেই শুরু হয়ে যায় বৈদ্যুতিক যুদ্ধ। একদিকে এডিসনের স্থির বিদ্যুৎ (ডিসি কারেন্ট) বনাম অন্যদিকে ওয়েস্টিংহাউজের সাথে মিলে টেসলার চলবিদ্যুৎ (এসি কারেন্ট)। বিজ্ঞানের ইতিহাসে এটা ‘বৈদ্যুতিক যুদ্ধ’ নামে পরিচিত।

১৮৮৫ সালে শুরু করলেন তার নিজের কোম্পানি “টেসলা ইলেকট্রিক লাইট এন্ড ম্যানুফ্যাকচারিং”। প্রথমে উদ্যোক্তারা সাহস পায়নি নতুন জায়গায় কাজ করতে; ফলাফল সর্বহারা হলেন। এ সময় তিনি বিভিন্ন ইলেকট্রিকাল কোম্পানিতে ২ ডলার বেতনে রিপেয়ারম্যানের চাকরি শুরু করেনঅবশেষে ১৮৮৬ সালে আলফ্রেড এস ব্রাউনের সহায়তায় ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন কোম্পানির সহায়তায় নতুন করে কাজ শুরু করেন।

নিকোলা টেসলা
src: nationalmaglab.org

যুক্তরাষ্ট্রের ম্যানহ্যাটন শহরে টেসলা গড়ে তোলেন তার নিজের ল্যাবরেটরি। সেখান থেকেই ১৮৮৭ সালে নিজের ডিজাইন করা ইন্ডাকশন মোটর তৈরি করেন। আর এই ইন্ডাকশন মোটরের মাধ্যমে ইউরোপের চেহারা বদলে যায়। এই ইন্ডাকশন মোটর দিয়ে টেসলা আকাশের নীল বজ্রকে নিয়ে আসেন ঘরে ঘরে এসি কারেন্ট রূপে। ১৮৯৫ সালে ডিন এডমিন্সের সহায়তায় নিকোলা টেসলা কোম্পানি নতুন করে গড়ে তোলা হয়। নিকোলা টেসলা ছিলেন কাজ পাগল এক মানুষ। তিনি ২৪ ঘণ্টায় মাত্র ৩ ঘণ্টা ঘুমাতেন বাকি সময় কাজ। এসি মটর থেকে প্রাপ্ত অর্থে তৈরি করেন নিজের গবেষণাগার। সেখানে বসে তিনি ১৮৮৯ সালে তৈরি করেন তার আরেক যুগান্তকারী আবিষ্কার ‘টেসলা কয়েল”।

টেসলার আবিষ্কার

টেসলার নামে ২৬টা দেশে প্রায় ৩০০ আবিষ্কারের পেটেন্ট রয়েছে। এর মধ্যে কিছুতো উপরেই উল্লেখ করা হয়েছে। আরও কিছু আবিষ্কারের মধ্যে আছে- বৈদ্যুতিক ঝাড়বাতি, এক্স-রে মেশিনের যন্ত্রপাতি, বাইফিলার কয়েল, ব্লেড বিহীন টারবাইন।

রেডিও এবং রিমোট কন্ট্রোল

আমাদের ঘরের টিভি থেকে শুরু করে খেলনা গাড়িড্রোন সহ বিভিন্ন কাজে রিমোট কন্ট্রোল আমাদের ঘরের আসবারের অংশ এখন। সাধারণ জ্ঞানের বইয়ে আমরা পড়েছি রেডিওর আবিষ্কারক মার্কনি। আসলে পেছনের গল্প ভিন্ন। ১৮৯২ সালে নিকোলা টেসলা সর্বপ্রথম রেডিওর ধারণা আনেন এবং এ নিয়ে কাজ করেন। ১৮৯৮ সালে ম্যানহ্যাটন শহরের ম্যাডিসন স্কয়ারের ঝর্ণায় সর্বপ্রথম রেডিও নিয়ন্ত্রিত খেলনা জাহাজ চালিয়ে লোকজনকে অবাক করে দেন। এরপর বড় মাপের রেডিও ট্রান্সমিশন তৈরি শুরু করেন নিকোলা টেসলা তার গবেষণাগারে কিন্তু আগুনে পুড়ে নষ্ট হয়ে যায় যন্ত্রপাতি। আর এই মূল ধারণা থেকেই মার্কনী বনে যান রেডিওর আবিষ্কারক!

ওয়াই-ফাই

আমাদের জীবনে ইন্টারনেট আর ওয়াই-ফাই এখন এক ছন্দ। এক মুহুর্ত এই ছন্দপতন আমরা মানতে পারি না। জানেন কিএই ওয়াই-ফাই প্রযুক্তি ধারণা দেন সর্বপ্রথম নিকোলা টেসলা? ১৯০৪ সালে টেসলা লং আইসল্যান্ডে গড়ে তোলেন বিশাল টাওয়ার শুধুমাত্র তারবিহীন সঙ্কেত আদান প্রদানের জন্য। তার মৃত্যুর অনেক বছর পর টেসলার গবেষণার উপর ভিত্তি করে ওয়াই-ফাই তৈরি করা হয়। নিকোলা টেসলার এই অবদানের জন্য সিলিকন ভ্যালিতে তার একটি মূর্তি তৈরি করা রয়েছে যেখান থেকে ফ্রি ওয়াই-ফাই সুবিধা দেওয়া হয়।

ওয়ারলেস লাইটিং

ওয়াই-ফাই ছেড়ে সামনে আসছে লাইফাই প্রযুক্তি। আলোর মাধ্যমে তথ্য আদান প্রদানের এই থিওরি নিয়ে আসেন নিকোলা টেসলা। তিনি চেয়েছিলেন তারবিহীন ভাবে আলো জ্বালাতে।

যদি শ্রেষ্ঠত্ব কেউ পেতে হয় তবে তা পাওয়া উচিত নিকোলা টেসলাকে । কোন সম্মানই তার জন্য যথেষ্ঠ না । তিনি হয়তো চলে গেছেন কিন্তু দিয়ে গেছেন অনেক কিছু।

আরো পড়ুনঃ আপনি কেন বিবর্তন বিশ্বাস করবেন না ?

Facebook Comments
পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন: