ডেঙ্গু পুরোপুরি দমন করার একমাত্র উপায় কি মশা চাষ?

ডেঙ্গু পুরোপুরি দমন করার একমাত্র উপায় কি মশা চাষ?

মশা ক্ষুদ্র একটা প্রাণি, যেটা সামান্য হাতের তালিতেই মরে যায়! এই মশার গড় আয়ু ৩-২০ দিন মাত্র!  সেই মশা-ই নাকি সারা বিশ্বের মোস্ট ওয়ান্টেড খুনি! মশা অন্যান্য যে কোনো প্রাণির তুলনায় সব থেকে বেশি মানুষকে মৃত্যুর কোলে পাঠায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, সারা বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ১০ লাখেরও বেশি মানুষের মৃত্যুর কারণ হলো মশার কামড়। ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, হলুদ জ্বর এবং চিকুনগুনিয়ার মতো রোগের কারণে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েছে, এবং এই সব রোগই মশাবাহিত। আর এ বছর বাংলাদেশে মহামারী আকারে দেখা দিয়েছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। ডেঙ্গু দমন করতে ব্যর্থতার ফলে ইতোমধ্যে প্রাণ হারাতে হয়েছে অনেক মানুষকে! এই ডেঙ্গু পুরোপুরি দমন করার একমাত্র উপায় হলো মশা চাষ! কি, শুনে অবাক লাগছে? বিশ্বাস হচ্ছে না? না হওয়াটাই স্বাভাবিক! তবে শুনতে অবাক লাগলেও এটাই সত্য যে, ডেঙ্গু দমন করতে চাইলে মশা চাষ করতে হবে! তাও আবার অ্যাডিস মশা (ডেঙ্গুর জীবাণু বহনকারী মশা) ! কেমনে কী, চলুন জেনে নেওয়া যাক!

ডেঙ্গু দমনে গুগলের ডিবাগ প্রজেক্ট:

সম্প্রতি মশা নির্মূল করার একটি অদ্ভুত পরিকল্পনায় ঠিক করা হয়েছে, মশার আরও প্রজনন ঘটাতে হবে। গুগলের প্যারেন্ট কোম্পানি অ্যালফাবেট (Alphabet) সম্প্রতি এমন আজব কর্মপদ্ধতিই ঠিক করছে।

অ্যালফাবেট পরিচালিত একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, ২০১৭ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার ফ্রেস্নোতে মশার বংশ ধ্বংস করার জন্য একটি প্রকল্প শুরু করেছিল। ‘ডিবাগ প্রজেক্ট’ (Debug Project) নামের এই প্রকল্পে ক্যালিফোর্নিয়ায় একটি গবেষণাগারে মশার উৎপাদন শুরু হয়েছে। এই পুরুষ মশাগুলো ওলবাখিয়া (Wolbachia) নামের ব্যাকটেরিয়ায় সংক্রামিত, যা স্ত্রী মশার শরীরে বন্ধ্যাত্ব সৃষ্টি করে। এই ব্যাকটেরিয়া আক্রান্ত পুরুষ মশাগুলোকে স্ত্রী মশার সঙ্গে সঙ্গম করার জন্য পরিবেশে ছেড়ে দেওয়া হয়। এর ফলে স্ত্রী মশারা বন্ধ্যা হয়ে যায় এবং মশার বংশবৃদ্ধি আস্তে আস্তে কমে আসে।

এই পরীক্ষা বাস্তবে কতটা সফল হয়েছে? ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে, ডিবাগ ক্যালিফোর্নিয়ার ফ্রেস্নোতে ১৫ মিলিয়নেরও বেশি সংক্রামিত মশার জন্ম দিয়ে তাদের ছেড়ে দিয়েছে। এর ফলে স্ত্রী মশার জনসংখ্যা দুই তৃতীয়াংশ হ্রাস পেয়েছে! প্রকল্পটি গড়ে মশার জনসংখ্যা প্রায় ৯৫% হ্রাস করতে সক্ষম হয়েছিল।

ডিবাগ (Debug Project) তাঁদের ওয়েবসাইটে জানিয়েছে, “ডিবাগ শুরুটা ভালোই করেছে, কিন্তু এখনও অনেক কিছু বাকি আছে। আমরা বেশ কিছু কমিউনিটির সাথে কাজ করার জন্য উন্মুখ, যাতে ডিবাগ এই পদ্ধতিতে মশার জনসংখ্যা ও রোগীদের উপর প্রকৃত প্রভাব ফেলতে পারে। আশা করি,  লক্ষ লক্ষ মানুষ দীর্ঘতর, সুস্থ জীবনযাপনে সাহায্য করতে পারব আমরা।”

ডেঙ্গু দমন করতে বাংলাদেশের এসআইটি টেকনিক:

সাভারের গণকবাড়ির পরমাণু শক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জীববিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের কীট জীবপ্রযুক্তি বিভাগের বিজ্ঞানীরা ডেঙ্গু দমন করতে সম্প্রতি স্টেরাইল ইনসেক্ট টেকনিক (এসআইটি) উদ্ভাবন করেছেন। এ পদ্ধতিতে পুরুষ অ্যাডিস মশাকে গামা রশ্মি প্রয়োগের মাধ্যমে বন্ধ্যা করা হয় এবং তা এ মশার প্রাদুর্ভাব রয়েছে এমন এলাকায় অবমুক্ত করা হয়। এ অবস্থায় প্রকৃতিতে বিদ্যমান স্ত্রী অ্যাডিস মশার সঙ্গে এই মশা মিলিত হওয়ার পর এটি যে ডিম কিংবা লার্ভা ছাড়ে, তা থেকে কখনই অ্যাডিস মশার জন্ম হয় না। এ কারণে এ মশার সংখ্যা দিন দিন কমতে থাকবে। ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে এটি একটি অত্যন্ত কার্যকর পদ্ধতি যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও পরিবেশবান্ধব। পুরুষ অ্যাডিস মশা মানুষকে কামড়ায় না, অন্যদিকে বন্ধ্যা পুরুষ অ্যাডিস স্ত্রী অ্যাডিসের ডিম বা লার্ভাকে নিষিক্ত করতে পারে না। তাই এসআইটি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

গতকাল ওই গবেষণাগার পর্যবেক্ষণ করে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে পদ্ধতিটি মাঠ পর্যায়ে প্রয়োগের নির্দেশ দিয়েছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান।

এই দুটো ছাড়াও আরও আছে, জেনেটিক্যালি মডিফাইড বা জিএম পদ্ধতি! ওই পদ্ধতিতেও মশার জিনে বিশেষ পরিবর্তন এনে মশাকে জেনেটিক্যালি মডিফাইড ‘বন্ধু মশা’ হিসেবে তৈরী করা হয়! তারপর তাদের প্রাকৃতিক পরিবেশে অবমুক্ত করা হয় মরণঘাতী ভাইরাস বহনকারী মশাগুলো থেকে বন্ধু মশার নতুন প্রজন্ম জন্ম দিতে! তবে এটা কিছুটা ব্যয়বহুল ও কঠিন পদ্ধতি!

তো যেটা দাঁড়াচ্ছে, কার্যকর পদ্ধতিগুলো ব্যবহার করার জন্য সবক্ষেত্রেই আমাদের ল্যাবরেটরিতে মশা চাষ করতে হবে! বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে গুগলের ডিবাগ পদ্ধতি অথবা এসআইটি দুটোই কার্যকর! আমাদের যেকোনো একটি দ্রুতই শুরু করতে হবে ডেঙ্গু দমন করতে! বিশ্বের অনেকগুলো দেশে এই পদ্ধতিগুলো প্রয়োগ করে সফলতা পেয়েছে! এ ছাড়া গত বছর বাংলাদেশের কক্সবাজার অঞ্চলে শুঁটকির আড়তে ক্ষতিকর মাছি দমন করতে এসআইটি এর মতো পদ্ধতি ব্যবহার করে সাফল্য পাওয়া গিয়েছিল!

আমাদের ঢাকাতে সিটি কর্পোরেশন থেকে মশা মারতে যে কীটনাশক স্প্রে করা হচ্ছে, দেখা গেছে ওটা শুধুমাত্র কিউলেক্স মশা মারতে সক্ষম, অ্যাডিস মশার উপর ওটার তেমন কোনো প্রভাবই পড়েনি! আর অনভিজ্ঞ, অ্যাডিস মশা সম্পর্কে শূন্য জ্ঞান নিয়ে, মশক নিধনকর্মীরা স্প্রে করে খালি ড্রেন, ডোবা-নালায়; যেখানে অ্যাডিস মশা জন্মায়ও না! তা ছাড়া এই কীটনাশক পরিবেশ ও আমাদের স্বাস্থ্যের জন্যেও ক্ষতিকারক! কীটনাশকে অর্থ ব্যয় না করে, বছরের শুরুতেই ডিবাগ কিংবা এসআইটির মতো পদ্ধতি প্রয়োগ করলে হয়তো এতগুলো প্রাণ অকালে ঝরে যেত না!

সূত্র: 

আরও পড়ুন: ডেঙ্গু প্রতিরোধে হারপিক ও ব্লিচিং পাউডার মিক্স! সত্য নাকি গুজব?

পাঠকের মন্তব্য:
পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন: