ফরিদপুরের গর্ভবতী নারী, সন্তান দাবি করা দুই বাবা ও একটি ডিএনএ টেস্ট!

ফরিদপুরের গর্ভবতী নারী, সন্তান দাবি করা দুই বাবা ও একটি ডিএনএ টেস্ট!
 

দায়বদ্ধতা থেকে ডিএনএ টেস্ট নিয়ে লিখতে বসলাম। আজ ভোরবেলা হঠাৎ একটা নিউজের হেডলাইনে চোখ আটকে গিয়েছিল। দেখি, ফেসবুক নিউজ ফিডে ভেসে আছে “ফরিদপুরে এক নারী গর্ভবতী, সন্তানের বাবা দাবি দুই যুবকের!” নিউজটাও একটা পপুলার অনলাইন পোর্টালের। কৌতুহলবশত ক্লিক দিয়ে ঢুকলাম! পুরো নিউজটা পড়ে খুবই আশাহত হলাম! কারণ ব্যাখ্যা করার আগে পুরো নিউজটা হুবুহু তুলে ধরছি-

“ফরিদপুরে অন্তঃসত্ত্বা এক নারীর গর্ভের সন্তানের পিতৃত্ব দাবি করেছেন দুই যুবক। নগরকান্দা উপজেলায় পুরাপাড়া ইউনিয়নের এ ঘটনা এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টির পাশাপাশি মুখরোচক খবরে পরিণত হয়েছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, উপজেলার পুরাপাড়া ইউনিয়নের গোয়ালদি গ্রামের আলমগীর কাজির মেয়ে নাজমা বেগমের সঙ্গে প্রায় ১০ বছর আগে গোপালগঞ্জের কাশিয়ানি উপজেলার জুনাসুর গ্রামের বাদশা লস্করের ছেলে ছাবু লস্করের বিয়ে হয়। পরে নাজমা বেগম ২০১৮ সালের ৩০ আগস্ট ছাবুকে তালাক দেন।

এরপর নিজের গ্রামের লাল মোল্লার ছেলে হেলাল মোল্লার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে নাজমার। ২০১৮ সালের ২৭ ডিসেম্বর হেলালের সঙ্গে নাজমার বিয়ে হয়। চলতি বছরের ১ মার্চ নাজমা হেলালকে তালাক দিয়ে আবরও আগের স্বামী ছাবুর সঙ্গে সংসার শুরু করেন। এরই মধ্যে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন নাজমা।

এখন দ্বিতীয় ও সদ্য তালাকপ্রাপ্ত স্বামী হেলালের দাবি, এই সন্তান তার। অন্যদিকে এই সন্তান নিজের বলে দাবি করছেন বর্তমানে নাজমার স্বামীর দায়িত্বে থাকা ছাবুও। বিষয়টি নিয়ে কয়েক দফায় সালিশ করেও কোনো সমাধান করতে পারেনি গ্রাম্য সালিশদাররা।

এ বিষয়ে হেলাল বলেন, নাজমার গর্ভের সন্তান আমার। কারণ নাজমা আগের স্বামীকে তালাক দিয়ে আমাকে বিয়ে করেছেন। এরপর আমার মাধ্যমই অন্তঃসত্ত্বা হন নাজমা।

অন্যদিকে, নাজমার গর্ভের সন্তান নিজের দাবি করে ছাবু বলেন, হেলাল আমার সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করেছে। সেজন্য নাজমাকে দিয়ে হেলালের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতন মামলা করানো হয়েছে। বিষয়টি আদালতে সমাধান হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি নাজমা।

এ ঘটনায় পুরাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুস সোবহান মিয়া বলেন, বিষয়টি স্থানীয়ভাবে মীমাংসার চেষ্টা চলছে। দেখি কি করা যায়!” 

নিউজ: সময়ের কণ্ঠস্বর 

প্রথমত নিউজটা ছিল ক্লিকবেইট! আকর্ষণীয় থামনেইল কিংবা হেডলাইন দিয়ে ভিজিটরকে আকৃষ্ট করার পন্থাটাকেই বলা হয় ক্লিকবেইট। অনেকে হয়তো আমাদের এই পোস্টটাতেও ক্লিকবেইটের শিকার হয়েছেন! অবশ্য এটা ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের বহুল প্রচলিত ও অনেক পুরোনো একটা টার্মও বটে। তাই এ নিয়ে আমার কোনো অভিযোগ নেই! তবে পপুলার পোর্টাল হিসেবে মানের দিকে আরেকটু নজর রাখা যেত।

এবার মূল নিউজে ফিরে যায়। নিউজের ঘটনাটা পড়ে এর সত্যতা নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ জেগেছে! নিউজটা যদি সত্য হয়, তবে এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক। কারণ, ওই পুরো এলাকায় কি একজনও শিক্ষিত ব্যক্তি ছিল না, যে ডিএনএ শব্দটা শুনেছে? ওখানটা এতটাই অজ্ঞতার অন্ধকারে নিমজ্জিত যে, বিজ্ঞানের আলো একটুও পৌঁছাতে পারেনি! ব্যাপারটা যদি সত্য হয় তবে বলতে হবে, আমাদের বাংলাদেশ উন্নত দেশগুলোর চেয়ে জ্ঞান-বিজ্ঞানে অন্তত ১০০ বছর পিছিয়ে আছে! যেখানে অন্য দেশে স্টিম সেল নিয়ে গবেষণা হচ্ছে, স্টিম সেল দিয়ে HIV এর মতো মরণব্যধিকে হারিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে, তার বিপরীতে আমাদের বাংলাদেশে চলছে বাচ্চা কার তা নিয়ে টানাটানি!

যাই হোক, এই নিউজের ঘটনা নিয়ে একটু বলি। এখন চলছে ২০১৯ সাল। এই বিজ্ঞান-প্রযুক্তি বিপ্লবের যুগে বাচ্চা কার, বাচ্চার বায়োলজিক্যাল মা-বাবা কে তা শনাক্ত করা একেবারে পানির মতো সোজা একটা ব্যাপার। যে পদ্ধতিতে এটা করা যায়, সেটাকে বলা হয় DNA profiling বা DNA Test নিচে পুরো বিষয়টা একেবারে সহজ ভাষায় বুঝানোর চেষ্টা করছি।

প্রথমে আমরা জেনে নিই ‘ডিএনএ’ কী?

ফরিদপুরের গর্ভবতী নারী, সন্তানের দাবি করা দুই বাবা ও একটি ডিএনএ টেস্ট !

ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড (ইংরেজি: DNA) একটি নিউক্লিক এসিড যা জীবদেহের গঠন ও ক্রিয়াকলাপ নিয়ন্ত্রনের জিনগত নির্দেশ ধারণ করে। সকল জীবের ডিএনএ জিনোম থাকে। একটি সম্ভাব্য ব্যতিক্রম হচ্ছে কিছু ভাইরাস গ্রুপ যাদের আরএনএ জিনোম রয়েছে, তবে ভাইরাসকে সাধারণত জীবন্ত প্রাণ হিসেবে ধরা হয় না। কোষে ডিএনএর প্রধান কাজ দীর্ঘকালের জন্য তথ্য সংরক্ষন। জিনোমকে কখনো নীলনকশার সাথে তুলনা করা হয় কারণ, এতে কোষের বিভিন্ন অংশে যেমনঃ প্রোটিন ও আরএনএ অণু, গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশাবলী থাকে। ডিএনএর যে অংশ এ জিনগত তথ্য বহন করে তাদের বলে জিন, কিন্তু অন্যান্য ডিএনএ ক্রমের গঠনগত তাৎপর্য রয়েছে অথবা তারা জিনগত তথ্য নিয়ন্ত্রনে ব্যবহৃত হয়। [উইকিপিডিয়া]

ডিএনএ টেস্ট করার কারণ ও ডিএনএ টেস্ট কীভাবে করা হয়?

কারণ:

এটা বুঝতে আমরা স্কুল লেভেলের বিজ্ঞান বইতে চলে যেতে পারি। আমরা সকলেই পড়ে এসেছি মানবদেহের প্রতিটি কোষে ২৩ জোড়া অর্থাৎ মোট ৪৬ টি ক্রোমোজোম থাকে। [আদতে দেহ কোষে ৪৬টি ও জনন কোষে ২৩টি] । এই ক্রোমোজোমগুলোর মধ্যে থাকে ডিএনএ ও আরএনএ। আবার ডিএনএ এর মধ্যে থাকে অসংখ্য জিন। এই জিনগুলোওই একেকটা আমাদের শরীরের একেকটা বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণ করে। যেমন: আমাদের চুলের রং, গায়ের রং, আচার-আচরণ, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি।

ফরিদপুরের গর্ভবতী নারী, সন্তানের দাবি করা দুই বাবা ও একটি ডিএনএ টেস্ট !

নিষেকের মাধ্যমে ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর মিলিত হয়ে জাইগোট তৈরীর সময় তাদের ২৩টি করে ক্রোমোজোম একত্রিত হয়ে ৪৬টি বা ২৩ জোড়া ক্রোমোজোম পূর্ণ করে! অর্থাৎ জাইগোটের ৪৬ টি ক্রোমোজোমের ২৩টি আসে ডিম্বাণু থেকে আর ২৩টি আসে শুক্রাণু থেকে। ফলে জাইগোট, ডিম্বাণু ও শুক্রাণু থেকে অর্ধেক অর্ধেক পরিমাণ জেনেটিক ম্যাটেরিয়াল বহন করে। এর মানে যা দাঁড়ায়, প্রতিটি মানুষ তার ৪৬টি ক্রোমোজোমের ২৩টি পায় মা থেকে, বাকি ২৩টি বাবা থেকে। ফলে মানুষের ডিএনএ এর অর্ধেক আসে মা, আর বাকি অর্ধেক আসে বাবা থেকে। এই জন্যেই মূলত ডিএনএ টেস্ট করা হয়! কারণ, ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে মা-বাবার ডিএনএ এর সাথে মিলালে যেকোনো মানুষরেই বায়োলজিক্যাল মা-বাবা শনাক্ত করা যায় সহজেই।

যেভাবে করা হয়:

কোনো মানুষের দেহ কোষ থেকে যৎসামান্য ডিএনএ সংগ্রহ করা গেলেও তার থেকে ওই মানুষের একটি ডিএনএ আলেখ্য তৈরি করা যায়। সুতরাং কোনো কোষ থেকে ডিএনএ আহরণ করার পর তার সাহায্যেই কোনো মানুষের ডিএনএ আলেখ্য তৈরি করা সম্ভব হয়। প্রাপ্ত ডিএনএ এর পরিমাণ কম হলে পিসিআর (PCR) পদ্ধতিতে ওই ডিএনএ এর পরিমাণ বাড়িয়ে নেওয়া যায়। কোনো লোকের দেহ কোষ থেকে প্রাপ্ত ডিএনএ এর থেকে কতিপয় পর্যায়ক্রমিক পদ্ধতি অনুসারে ওই ব্যাক্তির ডিএনএ আলেখ্য তৈরি করা যায়।

ফরিদপুরের গর্ভবতী নারী, সন্তানের দাবি করা দুই বাবা ও একটি ডিএনএ টেস্ট!

পরীক্ষার জন্য সংগ্রহ করা স্যাম্পলগুলোর ডিএনএ আলেখ্য তৈরী করার পর ডিএনএ টেস্ট করা হয়! এই সময় মূলত আলেখ্যগুলো মিলিয়ে দেখা হয়। যেহেতু সন্তান, পিতার অর্ধেক ও মাতার অর্ধেক ডিএনএ লাভ করে সেজন্য সন্তানের ডিএনএ আলেখ্যের সঙ্গে বাবা বা মায়ের ডিএনএ আলেখ্যের অর্ধেক মিল পাওয়া যায়। মিল পাওয়া গেলেই নিশ্চিত হওয়া যায় যে এই সন্তানের আসল বা বায়োলজিক্যাল মা-বাবা এরাই।

এমন সহজ একটা বিষয় নিয়ে অজ্ঞতা ও এরকম মুখরোচক খবর এদেশে নিত্য ঘটনা বলা যায়। কেউ অজ্ঞতার বশবর্তী, আবার কেউ টাকার ধান্ধায়।  তবুও আশা রাখি একদিন আলো আসবে। দূর হয়ে যাবে সবটুকু অন্ধকার। 

আরও পড়ুন:

Facebook Comments
পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন: