জমজ বাচ্চা ও কুসংস্কার

ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ, সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে অনেক অনেক কুসংস্কার ছড়িয়ে আছে আমাদের চারপাশে। অনেকে বিজ্ঞান পছন্দ করেনা । তাদের মতে বিজ্ঞান এ যা কিছু আছে সব ধর্ম থেকে নিয়ে আসা। জমজ বাচ্চা নিয়ে একটা কুসংস্কার আছে তা হলো জমজ কলা। এটা খেলে নাকি জমজ বাচ্চা হয়। সূর্যগ্রহনের দিন বিবাহিত অথবা গর্ভবতী মহিলাদের কাটাকাটি করতে নিষেধ করা হয়। কারন অনেকে মনে করেন এ সময় তরকারী কাটাকাটি করলে ঠোঁট কাটা (ডাক্তারি ভাষায় যাকে বলে Cleft Lip) বাচ্চা জন্ম নেয়।

বর্তমানে এসব কুসংস্কার কাটিয়ে মানুষ স্মার্ট হয়েছে । এখন প্রায় মেয়েই জমজ বাচ্চা চায়। তবে টুইন বেবি ব্যাপারটা সহজ কিছুনা । এটাতে অনেক সাইড ইফেক্টও রয়েছে । যেমন- হাইপারএমেসিস থেকে শুরু করে পিইটি (PET), এক্লাম্পশিয়া (Eclampsia), প্রিটার্ম লেবার (Preterm Labor) ইত্যাদি। এমন কি প্রসব পরবর্তী রক্তক্ষরণ (Postpartum Hemorrhage)-এর সম্ভাবনাও বেড়ে যায় অনেক গুণ।

টুইন বেবি ইচ্ছা করে নেয়া সম্ভব ?

উত্তর হলো সম্ভব না। টুইন বেবী হওয়া অ্যাক্সিডেন্ট এবং অপ্রত্যাশিত। বলা হয়ে থাকে, একটা মেয়ের সারা জীবনে ৫০০ বার ওভুলেশন হয়। কিন্তু সাক্সেসিভ গুলি লাগে না। মিসফিল্ডিং হয় বেশির ভাগ। তাই নিশানা ঠিক ও ডাবল করার জন্য ওভুলেশন ইনডিউসিং ড্রাগ খেলে দুই পাশ থেকে ২টি ডিম্বাণু আসতে পারে। কিন্তু সেই ক্ষেত্রে ডাইজাইগোটিক (Di-zygotic) হবে। অর্থাৎ ভিন্ন চেহারার বাচ্চা হবে। এছাড়াও IVF পদ্ধতি অনুসরণ করা যেতে পারে। তবে যে যাই বলেন, এটা পুরাই ন্যাচারাল থিওরি বা প্রাকৃতিক ব্যাপার। আপনি যা চাইবেন তা হওয়ার সম্ভাবনা কম। আবার এমনও হতে পারে না চাইতেই হয়ে গেল টুইন বেবি।

জমজ কিভাবে হয়?

যমজ সন্তান বলতে,দুটি অঙ্কুর বা দুটি ডিম থেকে, প্রতিটি পৃথক শুক্রাণু দ্বারা নিষিক্ত শুক্রাণু কোষ বিপরীতভাবে, দুই বা ততোধিক ভ্রূণের বিকাশ,যা গর্ভে দুই বা ততোধিক সন্তানের জন্ম দেয়।বিভিন্ন প্রকার যমজজিনগত ভাবে এবং নিষেক প্রক্রিয়ার দিক থেকে দেখলে সকল প্রকার যমজদের প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়:
মনোজাইগোটিক (Monozygotic) বা অভিন্ন যমজ (Identical Twin)
ডাইজাইগোটিক (Dizygotic) বা ভিন্ন যমজ (Non-identical Twin)

src=twin-pregnancy-and-beyond.com

উপরোক্ত দুই প্রকার যমজদের নিয়েবিস্তারিত বলার আগে একটা বিষয় জানা দরকার যে একটা শুক্রাণু সবসময় একটা ডিম্বাণুকেই নিষিক্ত করবে এবং নিষিক্ত হওয়ারপরপরই এটি খুব দ্রুত বিভাজন (Cleavage) শুরু হয়ে ভ্রূণ তৈরি করে এবং ধীরে ধীরে এটি পূর্ণাঙ্গ প্রাণীতে রূপান্তরিত হয়।
অভিন্ন যমজ (Monozygotic or IdenticalTwin) একটি মাত্র নিষিক্ত ডিম্বাণু থেকে যদি দুটি শিশুর জন্ম হয় তাকে অভিন্ন যমজ (Monozygotic Twin) সন্তান বলা হয়। এক্ষেত্রে নিষিক্ত ডিম্বাণুটি বিভাজিত হয়ে দুটি পূর্ণাঙ্গ শিশুতে পরিণত হয়। এর ফলে দুটি শিশুর জন্য কেবল একটি মাত্র ফুল বা অমরা (Placenta) থাকে। যেহেতু শিশুদুটি পুরোপুরি একই জীন (Gene) বহন করে এবং সকল বৈশিষ্ট্য একই রকম হয় তাই এদের কে অনেক সময় অভিন্ন যমজ (Identical Twin) বলা হয়।শিশু দুটির লিঙ্গ এবং সকল শারীরিক এবং মানসিক বৈশিষ্ট্য ওএক হয়ে থাকে। যমজ শিশুদের মধ্যে এই প্রকার শিশুরা শুধুমাত্র এক তৃতীয়াংশ। অনেক সময় এ ধরনের যমজ শিশু একজন অপরজনের কাছ থেকে পুরোপুরি আলাদা হয় না এবং জন্মের পরও এদের কিছু কিছু অঙ্গ সংযুক্ত থাকে (Siamese twin)। তবে চিকিৎসার মাধ্যমে এ সকল শিশুকে আলাদা করে একটি অর্থবহ জীবন দান করা বর্তমান বিশ্বে এখন আর অসম্ভব কিছু না।

ভিন্ন যমজ(Dizygotic or Non-identical Twin)যখন সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি নিষিক্ত ডিম্বাণু থেকে দুটি শিশু জন্ম নেয় আর এদের নিষিক্ত করা শুক্রাণু দুটিও পুরো ভিন্ন ভিন্ন, তখন তাদের ডাইজাইগোটিক যমজ বলে। যার অর্থ একই সাথে সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি শিশু ঘটনাক্রমে একই সময় জরায়ুতে বড় হচ্ছে। ফলে শিশু দুটির আলাদা আলাদা দুটি ফুল বা অমরা(Placenta) থাকে এবং এদের লিঙ্গও এক বা ভিন্ন হতে পারে। এমন দুটি শিশুর একসাথে লেগে থাকার সম্ভাবনা থাকেনা। যমজ বাচ্চাদের দুই তৃতীয়াংশই এমন ভাবে জন্ম নেয়। যার ফলে দেখা যায় যমজ হলেও এদের লিঙ্গ, রক্তের গ্রুপ, গড়ন, গায়ের রঙ বা অন্যান্য অনেক বৈশিষ্ট্য এক নয়। তবে দুজন একই রকম হওয়াটাওকিন্তু অসামঞ্জস্যপূর্ণ বা অস্বাভাবিক নয়। এক্ষেত্রে সম্পূর্ণ দুটি আলাদা ডিম্বাণু ওশুক্রাণু হওয়ার কারণে জেনেটিক দিক থেকে এরা ভিন্ন হয় একারণে এদের কে অন্যভাবে ভিন্ন যমজ (Non-identical Twin) বলা যায়।

জমজ বাচ্চা হলে কি কি সমস্যা হতে পারে ?

যমজ সন্তান হওয়া স্বাভাবিক একটিঘটনা হলেও যমজ সন্তান ধারণ করলে গর্ভবতী মাকে একটু বাড়তি সাবধানতা গ্রহণ করতে হয়। এ সকল মায়ের এনিমিয়া, এক্লাম্পসিয়া, এন্টিপারটাম হেমোরেজ, ম্যাল প্রেজেন্টেশন, প্রিটার্ম লেবারসহ নানাবিধ সমস্যা হবার সম্ভাবনা অনেক বেশী থাকে। এমনকিএক্ষেত্রে মৃত্যুর আশংকা ও যথেষ্ট বেশি। এজন্য এসকল ক্ষেত্রে শুরু থেকেই একজন স্ত্রী ও প্রসুতি রোগ বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে থাকলে মা এবং শিশু দুজনেরই জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।

বিশ্ব পরিসংখ্যানে জমজ১৯৮০ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত করা জরিপের তথ্যানুযায়ী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যমজ সন্তান জন্মের হার পূর্বের থেকে ৭৬% বৃদ্ধি পেয়েছে অর্থাৎ প্রতি ১০০০ জনে ১৮.৯ থেকে ৩৩.৩ জোড়া যমজ বাচ্চা হয়। সারা পৃথিবীর মধ্যে ইয়ুরুবা তে যমজ বাচ্চা জন্মের হার সব থেকে বেশি, প্রতি ১০০০ জনে ৪০-৫০ জোড়া যমজ বাচ্চা জন্মলাভ করে-এর কারণ হিসাবে দায়ী করা হয় তাদের খাদ্যাভ্যাসকে। ইয়াম নামের এক ধরনের খাদ্য তারা অনেক বেশি পরিমাণ খায় যেটা কিনা প্রাকৃতিকফাইটোইস্ট্রোজেন সমৃদ্ধ (ইস্ট্রোজেন ডিম্বাণু নিঃসরণের হার বৃদ্ধি করে)। মধ্য আফ্রিকাতেও এই পরিমাণে যথেষ্ট বেশি, প্রায় ১০০০ জীবিত বাচ্চার মধ্যে ১৮-৩০ যমজ জোড়া দেখা যায়।সে তুলনায় ল্যাটিন আমেরিকা, দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ায় যমজ বাচ্চা জন্মানোর হার বেশ কম পরিলক্ষিত হয়, মাত্র ৬-৯ জোড়া যমজ প্রতি ১০০০ জন জীবিত বাচ্চার মধ্যে। এছাড়া উত্তর আমেরিকা এবং ইউরোপ অন্তর্বর্তী অঞ্চলে জীবিত প্রতি ১০০০ জনে ৯-১৬ জোড়া যমজ জন্মগ্রহণ করে থাকে।

মানুষে মূলত দুই ধরণের যমজ দেখা যায়- অভিন্ন (Identical or Monozygotic Twin) ও ভিন্ন যমজ (Non-identical or Dizygotic Twin)। কেবলমাত্র একটি নিষিক্ত ডিম্বাণু থেকে যখন সমধর্মি ও একই লিঙ্গের যমজের জন্ম হয়ে থাকে, তখন আমরা তাকে অভিন্ন যমজ বলে থাকি।জমজ বাচ্চা খুব অস্বাভাবিক না হলেও পুরোপুরি স্বাভাবিক কিছুনা। যমজ সন্তানের জন্মদান কিছু কিছু ক্ষেত্রে মা ও সন্তান উভয়ের জন্য বিভিন্ন জটিলতার সৃষ্টি করে থাকে।

আরো পড়ুনঃ মাদকাসক্তি: জীবন যেখানে খেলনা

Facebook Comments