কৃত্রিম ব্যাকটেরিয়া তৈরি! মানুষ দিতে পারবে জীবন!

কৃত্রিম ব্যাকটেরিয়া তৈরি! মানুষ দিতে পারবে জীবন!
 

বিজ্ঞানীরা বিশ্বের প্রথম জীবন্ত জীব (কৃত্রিম ব্যাকটেরিয়া) তৈরি করেছেন যা সম্পূর্ণরূপে সিন্থেটিক এবং মূলত এর পরিবর্তিত ডিএনএ কোড রয়েছে। আমরা যেভাবে হার্ডডিস্ক , প্রসেসর এসব দিয়ে তৈরী করছি কম্পিউটার। ঠিক এভাবেই তৈরী করা যেতে পারে প্রাণ।

ল্যাব বানানো মাইক্রোব্যাক, সাধারণত মৃত্তিকা এবং মানুষের অন্ত্রের মধ্যে পাওয়া ব্যাকটেরিয়ার একটি স্ট্রেন, তার প্রাকৃতিক চাচাতো ভাইদের অনুরূপ কিন্তু জেনেটিক নির্দেশাবলীর একটি ছোট সেটের উপর বেঁচে থাকে। দুই বছরের প্রচেষ্টায়, ক্যামব্রিজের আণবিক জীববিজ্ঞানের চিকিৎসা গবেষণা কাউন্সিলের গবেষণাগার গবেষকরা পরিবর্তিত জিনোমের সিন্থেটিক সংস্করণ তৈরির ব্যাকটেরিয়াম এসচেরিচিয়া কোলাই (ই. কোলাই) এর ডিএনএ পুনর্বিবেচনা করেছিলেন এবং পুনরায় ডিজাইন করেছিলেন।

ই. কোলাই কী?

এটি একটি ব্যাকটেরিয়ার নাম, প্রায় সকল বহুকোষী উষ্ণ রক্তের প্রাণির পাকস্থলিতেই পাওয়া যায়। তবে মূল বিষয় সেটা নয়। এই ব্যাকটেরিয়া হলো জীববিজ্ঞান গবেষণায় সর্বাধিক ব্যবহৃত জীব। যুগান্তকারী সব আবিষ্কার এই ব্যাকটেরিয়াকে ঘিরে হয়েছে, নোবেল জয় তো হয়েছেই। এককোষী এই জীবকে আমরা সবচেয়ে ভালোভাবে চিনি বলে এর উপর গবেষণা করাটা আমাদের জন্য সহজ যেমন হয়, তেমনি কার্যকরী ফলাফলও বুঝতে পারা যায় সহজে। এরা দেখতে ‘রড’ এর মতো। এর মাধ্যমেই তৈরী হয়েছে কৃত্রিম ব্যাকটেরিয়া।

কৃত্রিম ব্যাকটেরিয়া তৈরি! মানুষ দিতে পারবে জীবন!
E. Coli , Image Credit: www.foodmanufacture.co.uk

কীভাবে তৈরী হয় প্রাণ?

আমরা জানি প্রতিটি জীবই নিউক্লিক অ্যাসিড নামের এক ধরনের তথ্যভান্ডার দিয়ে তৈরি আর এর দ্বারাই নিজের দেহকে ‘প্রোগ্রাম’ করে চলে। মানে দেহের কার্যকারিতা বা জীবের বেঁচে থাকার যে প্রোগ্রাম সেটা লেখা থাকে নিউক্লিক অ্যাসিডে, বেশিরভাগ জীবেই যেটা ডিএনএ নামে পরিচিত। এই ডিএনএ বিভিন্ন জীবে বিভিন্ন দৈর্ঘ্যের হয়। ডিএনএ তৈরি হয় চার ধরনের ক্ষারের সন্নিবেশনে। তো এই চারটা ক্ষার, তিনটা অক্ষর বা ডিজিটে সাজানো অবস্থায় কোষের কার্যকারী সংস্থা চিনতে পারে। যেমন, ক্ষারগুলি হলো A, T, G এবং C। তো তিন অক্ষর বা ডিজিটে এদেরকে বিভিন্নভাবে সাজানো চলে। যেমন: ATG বা GTC বা CTT ইত্যাদি। এভাবে ৬৪ টা বিভিন্ন বিন্যাস পাওয়া যায়, যাদেরকে কোডন বলে। ব্যাপার হলো এই ৬৪টা বিন্যাসকে কোষ চিহ্নিত করতে পেরে আলাদা আলাদা অ্যামিনো অ্যাসিড তৈরি করে। অ্যামিনো অ্যাসিড হলো কোষের শ্রমিক প্রোটিনের একক এবং প্রোটিনও বিভিন্ন বিন্যাসের অ্যামিনো অ্যাসিড দিয়ে তৈরি। বুঝতেই পারছেন, এই বিন্যাস নির্ধারিত হয় ডিএনএর ক্ষারের কোডন বিন্যাস দিয়ে। তিনটা ক্ষারের একটা কোডন একটা নির্দিষ্ট অ্যামিনো অ্যাসিডকে বোনার বার্তা দেয়।

 

Image Credit: cdn.kastatic.org

তো বিভিন্ন বিন্যাসে প্রোটিন তৈরি হলেও কোষে অ্যামিনো অ্যাসিড আছে মূলত ২০ টি। কিন্তু কোডন আছে ৬৪ টি। অর্থাৎ, একাধিক কোডন একটি নির্দিষ্ট অ্যামিনো অ্যাসিডকে কোড করতে বা বুনতে পারে। একে রিডানডেন্সি বলে। কেন এতগুলো কোডন দরকার তা এখনো কেউ বলতে পারে না সঠিক ভাবে। উপরে ৬৪ কোডনে ২০ অ্যামিনো অ্যাসিড আর থেমে যাওয়ার সংকেত। তিনটি ক্ষারের অবস্থান উল্লেখ করা আছে নিউক্লিওটাইড নাম দিয়ে। অ্যামিনো অ্যাসিডগুলো দেখানো হয়েছে বলের মতো করে।

যেমন: সেরিন নামের একটা অ্যামিনো অ্যাসিড তৈরি হতে পারে ৬টি কোডন দিয়ে! আর কোনো জিন সংশ্লেষণেরর শেষ হয় স্টপ কোডন দিয়ে, যেগুলো আছে ৩টি।

কৃত্রিম ব্যাকটেরিয়া তৈরীর গবেষণা

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা দলটির প্রধান ড. চিন মনে করলেন এতগুলো কোডনের কি আসলেই দরকার আছে সরল জীব ব্যাকটেরিয়ার? সেটা পরীক্ষা করলেন এই গবেষণায়। এর জন্য প্রয়োজন ছিল পুরো ব্যাকটেরিয়ার জিনোমকে নতুনভাবে সাজানো। সেটা তারা প্রথমে করলেন কম্পিউটারে। চারটি বর্ণের বিন্যাস হিসেবে প্রাণ বা জীব সাজানো বলে একে কম্পিউটারেই বেশ ডিজাইন বা নকশা করা চলে। তো একটি সম্পূর্ণ কৃত্রিম ডিএনএ’র নকশা করলেন যেখানে সেরিনের কোডন ৬টি থেকে ৪টিতে নামিয়ে আনলেন। স্টপ কোডন ৩টি থেকে ২টিতে নামিয়ে আনলেন। এবার ডিএনএটিকে কম্পিউটারের মডেল থেকে মেশিনে তৈরি করা শুরু করলেন। তার পরের কাজ ডিএনএর টুকরো গুলোকে ব্যাকটেরিয়াতে ঢোকানো। একটা ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়া নিয়ে সেটির ডিএনএকে বের করে ফেলে এই নতুন ডিএনএ ঢোকাতে থাকলেন। যখন সম্পূর্ণ ডিএনএ অদল-বদল করা শেষ তখন একটা সম্পূর্ণ নতুন ব্যাকটেরিয়া তৈরি হলো। এই আবিষ্কারে একটা মাইলস্টোনের ব্যাপার আছে। আগে পর্যন্ত সবচেয়ে বড় যেই জিনোম কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হয়েছিল, সেটা হলো প্রায় ১০লক্ষ নিউক্লিওটাইড সমষ্টির আর্কিয়া। এবারেরটা প্রায় ৪০লক্ষ নিউক্লিওটাইড সমষ্টির ব্যাকটেরিয়া ই. কোলাই!

সূত্র:

আরও পড়ুন: অযাচিত যৌন চাহিদা বা ধর্ষণ এর কারণ কী?

Facebook Comments
পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন: