করোনা ভাইরাস নিরাময় এ ভূমিকা রাখবে ‘নিশিন্দা’ গাছ!

করোনা ভাইরাস নিরাময় এ ভূমিকা রাখবে ‘নিশিন্দা’ গাছ!

গতকাল, শনিবার (০৭/০৩/২০২০) সকাল ১১টার দিকে ঢাকার সাতমসজিদ রোডে অবস্থিত ইউনিভার্সিটি অব ডেভলপমেন্ট অলটারনেটিভ (ইউডা) এর বায়োটেকনোলজি এবং জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ এর আয়োজনে ‘করোনা ভাইরাস এর সম্ভাব্য নিরাময় আবিষ্কার: বায়োইনফরম্যাটিক্স ভিত্তিক ব্যবস্থা’ সম্পর্কিত একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।

সেমিনারে মূল বক্তা হিসেবে ছিলেন উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ রহমতউল্লাহ। এ ছাড়া সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. কাজী শহিদুল্লাহ, বিশেষ অতিথি হিসেবে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি এবং মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. মামুন রশিদ চৌধুরী। অন্যান্যদের মধ্যে ইউডার বোর্ড অফ ট্রাস্টি এর প্রেসিডেন্ট জনাব অধ্যাপক মুজিব খান, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আর. আই. শরীফ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োটেকনোলজি এবং জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. রওনক জাহান এই সেমিনারে অংশগ্রহণ করেন। সেমিনারে সর্বস্তরের সিনিয়র ও জুনিয়র শিক্ষকবৃন্দ এবং সকল ব্যাচের ছাত্র-ছাত্রীরা উপস্থিত ছিলেন। এই সেমিনারে সম্প্রতি করোনা (কোভিড-১৯) ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব এবং এই বিষয়ে সচেতনতা, প্রতিরোধ ও করণীয়, সেইসাথে এর প্রতিষেধক তৈরিতে জীবপ্রযুক্তি এবং বায়োইনফরমেটিক্স এর সম্ভবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।

প্রধান বক্তা ও গবেষক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ রহমতউল্লাহ স্যার দাবি করেন- ‘করোনা (কোভিড-১৯) ভাইরাস নিরাময়ে ভূমিকা রাখতে পারে দেশীয় ভেষজ উদ্ভিদ ‘নিশিন্দা’! তিনি ও তাঁর গবেষণা দল নিশিন্দা উদ্ভিদে করোনার বিরুদ্ধে কাজ করার মতো তিনটি উপাদান খুঁজে পেয়ছেন। তবে এটি ভ্যাক্সিন আকারে মাঠ পর্যায়ে ব্যবহারের জন্য আরও গবেষণা ও ল্যাব টেস্টের প্রয়োজন রয়েছে!’

এ ছাড়া উক্ত সেমিনারে উপস্থিত শিক্ষকমন্ডলী এবং ছাত্র-ছাত্রীবৃন্দ বিভিন্ন প্রশ্ন করেন ও মন্তব্য দেন, যার ফলে সেমিনারটি প্রাণবন্ত ও শিক্ষামূলক হয়ে উঠে। এ ছাড়া বক্তারা সরকার, জনগণ ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই ভাইরাস দমনে সচেষ্ট হওয়ার আহ্বান জানান। সেমিনার শেষে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে করোনা ভাইরাসের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে একটি পোস্টার প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়।

‘করোনা ভাইরাস এর সম্ভাব্য নিরাময় আবিষ্কার: বায়োইনফরম্যাটিক্স ভিত্তিক ব্যবস্থা’ সেমিনারের কী-পয়েন্টগুলো: 

  • অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ রহমতউল্লাহ স্যার ও তাঁর গবেষণা দল দেশীয় ভেষজ উদ্ভিদ নিশিন্দা থেকে করোনা ভাইরাসের সৃষ্ট রোগ (কোভিড-১৯) নিরাময় এর উপায় বের করার চেষ্টা করছেন।
  • এই গবেষণায় এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত ফলাফল হলো- নিশিন্দা (Vitex negundo) গাছ হয়তো করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে। গবেষণায় তাঁরা এই গাছটিতে তিনটি উপাদান পেয়েছেন, যা করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়তে পারে। তবে তিনি জানিয়েছেন- এ বিষয়ে গবেষণাগারে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন।
  • তিনি বলেন, যেকোনো ভাইরাস বা ফাঙ্গাস প্রোটিন দিয়ে গঠিত। কিছু প্রোটিন আছে, যা ভাইরাসের বংশ বিস্তার এবং রোগ ছড়াতে কাজ করে। এ রকম কোনো প্রোটিনের সাথে যদি কোনো ছোট যৌগিক পদার্থ যুক্ত করে দেওয়া যায়, তাহলে প্রোটিন কাজ করতে পারে না। ফলে বংশবিস্তার ঘটে না। কোন যৌগিক পদার্থ ভাইরাসের প্রোটিনের সাথে যুক্ত হবে, সেটা কম্পিউটার প্রোগ্রাম দ্বারা নির্ণয় করা যায়, পদ্ধতিটিকে বলা হয় মলিকুলার ডকিং
  • এ পদ্ধতিতে গবেষণা করে তাঁরা নিশিন্দা গাছে পেয়েছেন অ্যাপিজেনিন, ভিটেক্সিন এবং আইসো ভিটেক্সিন নামের তিনটি যৌগিক পদার্থ যেগুলো নভেল করোনা ভাইরাসের সি-৩ প্রোটিনের সাথে যুক্ত হতে পারে। ইংল্যান্ডের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়েও এই গবেষণাটি যথার্থ বলে প্রমাণিত হয়েছে বলে জানান তিনি।
  • অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ রহমতউল্লাহ স্যার আরও বলেন- ‘অ্যাপিজেনিন, ভিটেক্সিন এবং আইসো ভিটেক্সিন নামের তিনটি যৌগিক পদার্থের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হওয়ার। কিন্তু তার আগে এটা গবেষণাগারে ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করে পরীক্ষা-নিরীক্ষার আরও প্রয়োজন রয়েছে।’ গবেষণার তথ্য-উপাত্ত পরীক্ষার জন্য ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়, নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের ক্যানভাস বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি।

যাই হোক, আমরা আশা করি সারা বিশ্ব করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় একত্রে এগিয়ে আসবে এবং আমরা শীঘ্রই করোনা ভাইরাস আতঙ্ক থেকে মুক্তি পাব।

F. A. Q:

করোনা ভাইরাস কী?

করোনা ভাইরাস হলো নিদুভাইরাস শ্রেণীর করোনাভাইরদা পরিবারভুক্ত করোনাভাইরিনা উপগোত্রের একটি সংক্রমণ ভাইরাস প্রজাতি। এ ভাইরাসের জিনোম নিজস্ব আরএনএ দিয়ে গঠিত। এর জিনোমের আকার সাধারণত ২৬ থেকে ৩২ কিলো বেস পেয়ার (kilo base-pair) এর মধ্যে হয়ে থাকে যা এ ধরনের আরএনএ ভাইরাসের মধ্যে সর্ববৃহৎ। করোনাভাইরাস শব্দটি ল্যাটিনকরোনা থেকে নেওয়া হয়েছে যার অর্থ মুকুট। কারণ ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ যন্ত্রে ভাইরাসটিকে দেখতে অনেকটা মুকুটের মতো দেখায়। ভাইরাসের উপরিভাগে প্রোটিন সমৃদ্ধ থাকে যা ভাইরাল স্পাইক পেপলোমার দ্বারা এর অঙ্গসংস্থান গঠন করে। এ প্রোটিন সংক্রামিত হওয়া টিস্যু বিনষ্ট করে। [সোর্স: উইকি]

কোভিড-১৯ সৃষ্টিকারী নভেল করোনা ভাইরাস কী?

কোভিড-১৯ রোগ সৃষ্টিকারী নভেল করোনা ভাইরাস এমন একটি সংক্রামক ভাইরাস - যা এর আগে কখনো মানুষের মধ্যে ছড়ায়নি। এই ভাইরাসটির আরেক নাম ২০১৯-এনসিওভি। এটি এক প্রকারের করোনা ভাইরাস। করোনা ভাইরাসের অনেক রকম প্রজাতি আছে, কিন্তু ২০১৯ সাল পর্যন্ত এর মধ্যে মাত্র ছয়টি মানুষের দেহে সংক্রমিত হতে পারত। তবে নতুন ধরনের এই নভেল করোনা ভাইরাসের কারণে সেই সংখ্যা এখন থেকে হবে সাতটি।

করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণ কী কী?

সর্দি, গলা ব্যথা, কাশি, মাথা ব্যথা, জ্বর, হাঁচি, অবসাদ ও শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া।

করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ করব কীভাবে?

১. হাঁচি বা কাশির পরে হাত ধুয়ে নিন। ২. কাশি বা হাঁচির আগে মুখ ঢেকে নিন। ৩. আপনার যদি মনে হয় যে আপনি সংক্রামিত, তাহলে কোনো ব্যক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এড়িয়ে চলুন। ৪. রান্না না করা গোশত ও ডিম খাওয়া এড়িয়ে চলুন। ৫. নিজেকে সারাক্ষণ হাইড্রেট রাখুন। ৫. লক্ষণগুলো দেখা দেয়া মাত্রই ওষুধ খান এবং পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে উঠতে দেবেন না। ৬. ধোঁয়াটে এলাকা বা ধূমপান করা এড়িয়ে চলুন। ৭. যথাযথ বিশ্রাম নিন। ৮. ভিড় থেকে দূরে থাকুন।

করোনা ভাইরাস এর সম্ভাব্য নিরাময় কী?

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ রহমতউল্লাহ স্যারের বক্তব্য অনুযায়ী- 'করোনা (কোভিড-১৯) ভাইরাস নিরাময়ে ভূমিকা রাখতে পারে দেশীয় ভেষজ উদ্ভিদ 'নিশিন্দা (Vitex negundo)'! তিনি ও তাঁর গবেষণা দল নিশিন্দা উদ্ভিদে করোনার বিরুদ্ধে কাজ করার মতো তিনটি উপাদান খুঁজে পেয়ছেন। তবে এটি ভ্যাক্সিন আকারে মাঠ পর্যায়ে ব্যবহারের জন্য আরও গবেষণা ও ল্যাব টেস্টের প্রয়োজন রয়েছে!'

নিশিন্দা উদ্ভিদ কীভাবে করোনা ভাইরাস নিরাময় বা প্রতিরোধ করতে পারে?

যেকোনো ভাইরাস বা ফাঙ্গাস প্রোটিন দিয়ে গঠিত। কিছু প্রোটিন আছে, যা ভাইরাসের বংশ বিস্তার এবং রোগ ছড়াতে কাজ করে। এ রকম কোনো প্রোটিনের সাথে যদি কোনো ছোট যৌগিক পদার্থ যুক্ত করে দেওয়া যায়, তাহলে প্রোটিন কাজ করতে পারে না। ফলে বংশবিস্তার ঘটে না। তো, নিশিন্দা গাছে অ্যাপিজেনিন, ভিটেক্সিন এবং আইসো ভিটেক্সিন নামের তিনটি যৌগিক পদার্থ পাওয়া গেছে, যেগুলো নভেল করোনা ভাইরাসের সি-৩ প্রোটিনের সাথে যুক্ত হতে পারে।

Facebook Comments
পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন: