আগুন আসলে কী?

আগুন আসলে কী?
 

বিজ্ঞান নিয়ে যারা একটু খোঁজ খবর রাখেন তাদের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে আগুন আসলে কী? পদার্থ নাকি শক্তি? মৌল বা যৌগ? মানুষ প্রথম নিজেরাই আগুন আবিষ্কার করে। পরবর্তীতে আবার আগুনকে দেবতা ভাবতেও শুরু করে। আজকের এই আধুনিক সমাজ গঠনে আগুনের ভূমিকা অপরিসীম। প্রাচীন গ্রীকদের ধারণা ছিল, আগুন চারটি মৌলিক উপাদানের একটি যা দিয়ে জগতের সব কিছু গঠিত। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, আগুন মৌলিক পদার্থ তো নয়ই বরং আগুনের বিজ্ঞান যথেষ্ট জটিল। আগুনের শিখায় শত শত জটিল বিক্রিয়া ঘটতে থাকে এবং জটিল যৌগ উৎপন্ন ও পরিবর্তিত হতে থাকে।

আগুন সম্পর্কে গ্রিক মিথ:

গ্রিকদের প্রধান দেবতা জিউস, তার দুই ছেলে প্রমিথিউস আর এপিমেথিউসকে মানুষ আর পশু পাখি সৃষ্টির নির্দেশ দেন। আরও বলেন সৃষ্টির পর এদেরকে যেন কোনো পুরষ্কার দেওয়া হয়। প্রমিথিউস মানুষ সৃষ্টির দায়িত্ব নেয়। সে দেবতাদের অবয়বে মানুষ তৈরি করে। বানানো শেষে সে তার ভাই এপিমেথিউসের সাথে পরামর্শ করতে যায় যে মানুষকে কী পুরষ্কার দেওয়া যায়! কিন্তু এপিমেথিউস বলে যে, উপহার যা ছিল সে তার সবই বিলিয়ে দিয়ে ফেলেছে।

এই সমস্যার সমাধানে প্রমিথিউস ঠিক করে যে সে মানুষকে আগুন উপহার দেবে, যদিও শুধুমাত্র দেবতাদেরই অধিকার ছিল আগুনে। প্রমিথিউস সূর্য উড্ডয়নকালে সূর্য দেবতার কাছ থেকে কিছু আগুন চেয়ে নেয় তারপর মানুষকে আগুনের ব্যবহার শিখিয়ে দেয়।

আর একটা বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, মানুষকে দেওয়ার মতো কোনো পুরষ্কার না পেয়ে প্রমিথিউস জিউসকে জিজ্ঞেস করে যে, মানুষকে পবিত্র আগুন উপহার দিতে পারবে কিনা। জিউস রাজি না হওয়ায় প্রমিথিউস শাস্তির ভয় উপেক্ষা করে, জিউসের ঘরের উনুন থেকে আগুন চুরি করে মানুষকে দিয়ে দেয়। এটা ছিল তার পক্ষ থেকে মর্ত্যবাসীদের জন্যে উপহার যাতে দীর্ঘ ঠান্ডা রাতগুলোয় তাদেরকে কাঁপতে না হয়।

আগুন আসলে কী?

কোনো জারকের সাথে কোনো কিছুর বিক্রিয়া হওয়াকে Combustion বা, দহন বলা হয়। আগুন কোনো পদার্থ নয়। আগুন হলো ‘দহন’ (Combustion) বিক্রিয়ার দৃশ্যমান রূপ। যখন কোনো জ্বালানি অক্সিজেনের উপস্থিতিতে নির্দিষ্ট পরিমাণ তাপ পায় তখন রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে এবং শক্তি উৎপন্ন হয়। এই প্রক্রিয়াটি হলো Complete Combustion. আবার আমরা এটাও জানি যে, পরমাণুতে ইলেকট্রনগুলো নির্দিষ্ট দূরত্বের ও নির্দিষ্ট শক্তির কিছু কক্ষপথে অবস্থান করে।

দহন হয় শুধুমাত্র হয় গ্যাসের সাথে গ্যাসের বিক্রিয়ায়। কিন্তু মাত্রই বলা হলো যে, দহন মানে হচ্ছে যখন অক্সিজেনের সাথে জ্বালানির বিক্রিয়া। আর জ্বালানি: কঠিন, তরল, বায়বীয় সবই হতে পারে। তাহলে?

আসলে দহনের ক্ষেত্রে কঠিন বা তরল জ্বালানিকে এত তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করা হয় যে পদার্থটা তার পৃষ্ঠ থেকে গ্যাস নিঃসরণ করতে শুরু করে।

তখন গ্যাসের অণুগুলো ভেঙে যায় আর ভাঙা অংশের একটা অংশ বাতাসের অক্সিজেনের সাথে যুক্ত হয়ে নতুন কোনো যৌগ তৈরি করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পানি আর কার্বন ডাই-অক্সাইড উৎপন্ন হয়।

যেমন ধরুন, কাগজে আগুন ধরে কীভাবে? কাগজের কাছে আগুন আনলে, আগুনের প্রভাবে কাগজের অণুগুলো ছোটাছুটি শুরু করে আর পরস্পর থেকে দূরে সরে গিয়ে গ্যাসে পরিণত হয়। তখন গ্যাসের অণু অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়া শুরু করে আর কাগজের দহন শুরু হয়।

আগুন দেখা যায় কেন?

মাত্রই আমরা জানলাম যে, দহনের সময় গ্যাসের অণু ভেঙে যায়। এই অণুগুলো যখন ভাঙে তখন তাপ শক্তি বিকিরণ বা শোষণ হয়। তাপশক্তি সীমিত পরিসরে এক ধরনের গতিশক্তি। রিচার্ড ফাইনম্যানের মতে, তাপ হচ্ছে ‘পরমাণুর ঝাঁকি’। তো এই ঝাঁকাঝাঁকির ফলে তৈরি হয় তড়িৎচৌম্বকীয় তরঙ্গ অর্থাৎ আলো। আর আমরা আগুন দেখতে পাই।

আরও পড়ুন: আলোর গতি মাপা হলো কীভাবে?

Facebook Comments
পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন: