Home » অ্যালিসা কার্সন কি প্রথম মানুষ হিসেবে মঙ্গলগ্রহে যাবেন?
অ্যালিসা কার্সন কি প্রথম মানুষ হিসেবে মঙ্গলগ্রহে যাবেন?

অ্যালিসা কার্সন কি প্রথম মানুষ হিসেবে মঙ্গলগ্রহে যাবেন?

বিভিন্ন দেশি-বিদেশি প্রথম সারির পোর্টালে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে গত ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আমাদের বিজ্ঞান নিউজ সাইটে একটা আর্টিকেল প্রকাশিত হয়; ‘অ্যালিসা কার্সন : মঙ্গলের বুকে প্রথম মানবী হবেন যিনি!’ শিরোনামে! ওই আর্টিকেলটি আংশিক সত্য হলেও, অ্যালিসা কার্সন এর মঙ্গল যাত্রার বিষয়ে কোনো উল্লেখযোগ্য প্রমাণ বা সত্যতা পাওয়া যায়নি। একারণে আমাদের অন্যান্য আর্টিকেলের তুলনায় ওই আর্টিকেলে অনেক বেশি এসইও ট্রাফিক থাকা সত্ত্বেও আমরা পোস্টটি বিজ্ঞান নিউজ থেকে সরিয়ে ফেলেছি এবং ওই আর্টিকেলে থাকা ভুল তথ্যের জন্য আমরা বিজ্ঞান নিউজের সকল পাঠক – শুভাকাঙ্খীদের কাছে আন্তরিকভাবে দুঃখিত।

অ্যালিসা কার্সন এর আসল সত্যটা কি? চলুন তাহলে জানা যাক- অ্যালিসা কার্সন আসলেই প্রথম মানুষ হিসেবে মঙ্গলগ্রহে যাবেন কিনা?

অ্যালিসা কার্সন কি প্রথম মানুষ হিসেবে মঙ্গলগ্রহে যাবেন?

সব তথ্য যাচাই-বাছাই করে আমরা যা পেয়েছি, তা থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না যে, অ্যালিসা কার্সন আসলেই মঙ্গলচারী প্রথম মানবী হবেন কি, হবেন না! কারণ, মঙ্গলে মানুষ পাঠানোর ব্যাপারে এখনো কোনো মহাকাশ গবেষণা সংস্থা শতভাগ নিশ্চিত নন। ফলে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে মঙ্গলে পাঠানোর ব্যাপারেও সিদ্ধান্ত হয়নি! মঙ্গলে হিউম্যান কলোনি স্থাপনের জন্য কাজ করা মারস-ওয়ান প্রজেক্ট ২০৩১ সালে প্রথমবারের মতো মঙ্গলগ্রহে মানুষ পাঠানোর প্ল্যান করেছে, কিন্তু কোনো একা মানব কিংবা একা মানবীকে না! তারা ক্রু হিসেবে অন্তত ২৪ জনের দল পাঠাবে প্রথমবার! [১] তাই অ্যালিসা কার্সন মঙ্গলে যাওয়া প্রথম মানুষ হবেন, এই তথ্যের এখন পর্যন্ত কোনো ভিত্তি নেই!

অ্যালিসা কার্সনকে নিয়ে বিভ্রান্তিকর খবর ছড়ানোর সূত্রপাত হয় বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই! তাকে নিয়ে ছড়ানো সবচেয়ে জনপ্রিয় ভুল তথ্যগুলো হলো- অ্যালিসা মঙ্গলচারী প্রথম মানুষ হবেন, মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা তাকে ২০৩৩ সালে মঙ্গলগ্রহে পাঠাবেন এবং এজন্য নাসা তাকে স্পেশাল প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, তিনি মঙ্গলগ্রহ থেকে আর কখনো ফিরবেন না! এগুলো সবই ভুল তথ্য। [২] ভুল তথ্যগুলো আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে; জনপ্রিয় ট্রেডএক্স চ্যানেলে অ্যালিসার দেওয়া একটা ইন্টারভিউর ভুল ব্যাখ্যা এবং অ্যালিসার অফিশিয়াল ওয়েবসাইটের ডোমেইন নেম: nasablueberry.com হওয়ার কারণে!

আমাদের প্রকাশিত পূর্বের সেই আর্টিকেলে ওপরের ভুলগুলো বাদে অ্যালিসা সম্পর্কে উল্লেখিত বাকি সব তথ্যই সঠিক ছিল! এখন আপনাদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, আসলে সঠিক তথ্যগুলো কী কী! অ্যালিসা কার্সন সম্পর্কে আমাদের সংগৃহীত সঠিক তথ্যগুলো নিচে তুলে ধরছি-

ছোটোবেলা থেকেই অ্যালিসার স্বপ্ন মহাকাশযাত্রার। বিশেষ করে সৌরজগতের লালগ্রহ মঙ্গল সবচেয়ে বেশি টানে তাকে! ৯ বছর বয়স থেকেই স্বপ্ন দেখছেন মঙ্গলে পাড়ি দেওয়ার! শুধু স্বপ্ন দেখেই থেমে থাকেননি অ্যালিসা, স্বপ্নপূরণের জন্য ইতিমধ্যেই করে ফেলেছেন অনেককিছু! কোথাও না থেমে, দুরন্ত গতিতে ছুটছেন স্বপ্নের পেছনে! তার স্বপ্ন এবং স্বপ্নপূরণের প্রচেষ্টার কথা-ই মূলত ইন্টারভিউতে উল্লেখ ছিল। [৩] কিন্তু কথাগুলো ভুল ব্যাখ্যা করে, ভুল নিউজ করে ফেলেছে অনেক নিউজ পোর্টাল!

১৯ বছর বয়সি অ্যালিসা কার্সন ৩ বার স্পেস শাটল লঞ্চ প্রত্যক্ষ করেছেন, ৭ বার অংশগ্রহণ করেছেন স্পেস ক্যাম্পে, স্পেস অ্যাকাডেমিতে ৩ বার, রোবোটিক অ্যাকাডেমিতে ১ বার, এ ছাড়া সে অ্যাডভান্স স্পেস অ্যাকাডেমির সর্বকনিষ্ঠ গ্র্যাজুয়েট! এখানেই শেষ নয়, অ্যালিসা স্পেস ক্যাম্প তুর্কিস্পেস ক্যাম্প কানাডাতে অংশ নিয়ে, নাসার ৩টি স্পেস ক্যাম্পেই অংশ নেওয়া পৃথিবীর প্রথম ব্যক্তি হয়েছেন! এ ছাড়া ৯টি স্টেটে নাসার ১৪ টি ভিজিটরস সেন্টারে ভিজিট করে, পৃথিবীর প্রথম ব্যক্তি হিসেবে নাসা পাসপোর্ট প্রোগ্রাম সম্পন্ন করেছেন! ২০১৩ সালে অ্যালিসা MER 10 প্যানেলে মঙ্গলে ভবিষ্যৎ অভিযান সম্পর্কে আলোচনার জন্য নাসা টিভিতে আমন্ত্রিত হন। এরপর ২০১৬ সালে অ্যালিসা অ্যাডভান্স পসাম অ্যাকাডেমি থেকে সর্বকনিষ্ঠ হিসেবে গ্রাজুয়েট হন এবং মহাকাশে যাওয়ার অফিশিয়াল সার্টিফিকেট পান! এর মধ্যে সে আবার মঙ্গলে হিউম্যান কলোনি স্থাপনের লক্ষ্যে কাজ করা করা মারস-ওয়ান প্রজেক্টের ৭ জন অ্যাম্বাসেডরের একজনও হন। [৪]

এতসবের কারণেই তাকে নিয়ে বিভ্রান্তিগুলো ছড়িয়ে পড়েছে। মহাকাশ যাত্রার জন্য অ্যালিসা যত পড়াশোনা ও প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, সবই ব্যক্তি উদ্যোগে; নাসা তাকে অফিশিয়াল মেম্বার হিসেবে এসব করাইনি, এমনকি তাকে মঙ্গলে পাঠানোর জন্য মনোনীতও করেনি! আর তার অফিশিয়াল ওয়েবসাইটের ডোমেইনে নাসা শব্দটা সে পছন্দের জায়গা থেকে, নাসাকে ভালোবেসে যুক্ত করেছেন; সাথে ব্লুবেরি শব্দটা তার কল সাইন! তো, এই ডোমেইন নেমের সাথে নাসার অফিশিয়াল কোনো সম্পর্ক নেই! অন্যদিকে অ্যালিসা মারস-ওয়ান এর অ্যাম্বাসেডর হলেও, মঙ্গলে পাঠানোর জন্য মনোনীত ক্রু নন। মারস-ওয়ান থেকে মঙ্গলে পাঠানোর জন্য এখনো কোনো ক্রুকেই ফাইনাল সিলেকশন করা হয়নি এবং তাদের রোডম্যাপে বলা আছে, প্রথমবার ৪ জনের ৬ টা গ্রুপ মঙ্গলে পাঠানো হবে! তাই অ্যালিসা যদি মারস-ওয়ান প্রজেক্টের মাধ্যমে মঙ্গলে যাত্রা করেনও, তবুও সে একলা যাবেন না! [১]

আন্তর্জাতিক ফ্যাক্ট চেকিং ওয়েবসাইট স্নোপস ডট কম কয়েক বছর আগেই অ্যালিসার মঙ্গল যাত্রা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেই প্রতিবেদনে অ্যালিসাকে নিয়ে প্রচলিত খবরের কী কী সত্য আর কী কী ভুল; সকল তথ্য গুছিয়ে দেওয়া আছে! আপনারা এই প্রতিবেদনটি পড়ে দেখতে পারেন!

অ্যালিসা কার্সন সম্পর্কে বিজ্ঞান নিউজের সর্বশেষ অভিমত:

যে স্বপ্নের পেছনে দুরন্ত গতিতে ছোটে, সে মানুষ কখনো স্বপ্নকে হাতছাড়া হতে দেয় না! অ্যালিসার এত এত অর্জন ও প্রচেষ্টা সাক্ষী দেয় যে, সে একদিন তার স্বপ্ন পূরণ করবেই! সময়টা যখনই হোক, অ্যালিসা কার্সন লালগ্রহ মঙ্গলের বুকে হারিয়ে যাবেন; সেটা মোটামুটি নিশ্চিত। তবে অ্যালিসা যে পৃথিবীর প্রথম মানুষ হিসেবে মঙ্গলগ্রহে যাবেন, সেটার সম্ভাবনা খুব কম! অবশ্য প্রথম নারী হিসেবে যাবার সম্ভাবনা কিন্তু যথেষ্ঠ আছে! কী হবে, কখন হবে; আমরা কেউ-ই জানি না; সময়ই বলে দেবে সব! তাই আমাদের উচিত সবকিছু সময়ের ওপর ছেড়ে দেওয়া আর অ্যালিসা কার্সন নামক স্বপ্নবাজ, দুরন্ত অভিযাত্রীকে সমর্থন জানানো!

তথ্যসূত্র:

  1. মারস-ওয়ান
  2. স্নোপস
  3. UPROXX
  4. নাসাব্লুবেরি [অ্যালিসা কার্সনের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট]

আরও পড়ুন: হাইপেশিয়া: গণিতের প্রথম মহীরুহ নারী এবং একটি মর্মান্তিক মৃত্যুর ইতিহাস!

পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন: