Home » অলৌকিক ঘটনা কীভাবে ঘটে? [পর্ব ০১]
অলৌকিক ঘটনা কীভাবে ঘটে? [পর্ব ০১]

অলৌকিক ঘটনা কীভাবে ঘটে? [পর্ব ০১]

অলৌকিক ঘটনা কীভাবে ঘটে?

কোনো এক বাড়িতে আপনি বেড়াতে গেলেন সেখানে আপনি দরজা খুলে রেখে আসলেন, আর প্রায় সাথেই সাথেই খুব জোরে দরজা লেগে গেল। আপনি হঠাৎ শুনতে পেলেন শাওয়ার এর পানি পড়ছে। আপনি শুয়ে আছেন আর স্পষ্ট বুঝতে পারলেন আপনার পাশে কেউ একজন শুয়ে আছে। খুঁজেছেন ব্যাখ্যা। কিন্তু কোনো ব্যাখ্যা নেই। তখন স্বভাবতই মনে হবে ভূতের কাজ। অলৌকিক ঘটনা ঘটছে মনে হবে। চক্ষু বিশেষজ্ঞ ‘উইলিয়াম ভিলমার (William Wilmer)’ ১৯২১ সালে ‘আমেরিকান জার্নাল অব অফথালমোলজি’তে একটা আজব ধরনের গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছিলেন। তার গবেষণা মতেই বেরিয়ে আসে এসবের ব্যাখ্যা।

যদি কোনো ঘরে ভেন্টিলেশন এর অভাব হয় বা কোনো এক কারণে কার্বন মনোক্সাইড (CO) এর পরিমাণ বেড়ে যায় তাহলে এমন ঘটনা প্রায় ঘটতে পারে। কার্বন মনোক্সাইড (CO) হচ্ছে গন্ধবিহীণ, বর্ণবিহীন বিষাক্ত গ্যাসীয় পদার্থ। উন্মুক্ত পরিবেশে এই গ্যাসকে সহজে শনাক্ত করা যায় না। আমাদের মানবশরীরের রক্ত যত সহজে অক্সিজেন শোষণ করতে পারে ঠিক তত সহজেই কার্বন মনোক্সাইডও শোষণ করে ফেলতে পারে। এর ফলে দেখা দেয় শারীরিক দূর্বলতা, বমি বমি ভাব, দুশ্চিন্তা, মানসিক অস্থিরতা ইত্যাদির মতো উপসর্গ। রক্তে এই বিষক্রিয়ার মাত্রা সামান্য একটু বেশি হলে মানুষ মারাও যেতে পারে। তবে সবচেয়ে বড়ো ব্যাপার যেটা সেটা হলো মৃত্যুর দিকে আগানোর সাথে সাথে এই বিষক্রিয়ায় আপনার ভেতরে হ্যালুসিনেশানের মাত্রাও বাড়তে থাকবে। তখন ভূতের মতো অনেক কিছুই চোখের সামনে আসতে পারে। কার্বন মনোক্সাইড (CO) তৈরি হয় ডিজেল এবং পেট্রোলচালিত গাড়ি ও যন্ত্রপাতি, গ্যাসের চুলা এবং লাকড়ির চুলা ইত্যাদি থেকে। একটা দরকারি তথ্য হচ্ছে- যে চুলায় আগুনের শিখা নীল সেই চুলার থেকে হলুদ আগুনের শিখাবিশিষ্ট চুলা সাধারণত বেশি কার্বন মনোক্সাইড উৎপন্ন করে থাকে

অলৌকিক ঘটনা কীভাবে ঘটে? [পর্ব ০১]
অলৌকিক ঘটনা কীভাবে ঘটে
এরপরের কাহিনিটা, যারা গ্রামাঞ্চলে থাকেন তারা ভালো জানেন। রাতের আঁধারে টর্চ নিয়ে পুকুরে আর ডোবার কিনারায় কিনারায় ঘুরছেন মাছ ধরার জন্যে। কিংবা মাছ ধরা নয়, এমনিতেই বাড়ির বাইরে বেরিয়েছেন কোনো কাজে। হঠাৎ দেখলেন ডোবার ধারে জঙ্গলের মতো জায়গায় এক টুকরো আলো ভেসে বেড়াচ্ছে। সেটা এদিক সেদিক বাতাসে ঘুরে বেড়াচ্ছে। নিশ্চয়ই জিন-পরির কাজ! যারা সাহসী তারা একটু এগিয়ে গেলেন জিন/পরিটাকে ধরতে। কিন্তু দূর্ভাগ্য, কাছে যেতেই আপনার উপস্থিতি টের পেয়ে আলোটা নিভে গেল। জিন/পরি আপনাকে দেখে উড়ে চলে গেছে! এটাও একটা অলৌকিক ঘটনা মনে করে অনেকে।

অথচ, ইংরেজিতে এই আলোটাকে বলে ‘Will-o’-the-wisps’. বাংলায় ডাকা হয় ‘আলেয়া’ নামে। এর আগে একটা ভুতুড়ে ঘটনার ব্যাখ্যায় আপনাদের নিয়ে গিয়েছিলাম উইলিয়াম ভিলমারের কাছে। এখন চলুন যাই ‘আলেজান্দ্রো ভোল্টা (Alessandro Volta)’র সাথে দেখা করতে। ১৭৭৬ সালে আলেজান্দ্রো ভোল্টা সর্বপ্রথম মিথেন গ্যাস আবিষ্কার করেন। তিনিই সর্বপ্রথম সন্দেহ করেছিলেন আলেয়ার আলোর মতো ভুতুড়ে ঘটনার পেছনে মিথেন গ্যাসের হাত আছে। তাঁর সেই তত্ত্বই পরে আধুনিক বিজ্ঞানের ধারণা দিয়ে আরও নিখুঁত ও পরিশোধিত হয়েছে।

পৃথিবীর সব গাছপালা, পশু-পাখি, মানুষ মূলত জটিল হাইড্রোকার্বন জৈবযৌগের সমন্বয়ে গঠিত। এইসব জৈবযৌগের মূল উপাদান কার্বন, হাইড্রোজেন এবং অক্সিজেন। এইসব জৈবযৌগ যখন উন্মুক্ত পরিবেশে অক্সিজেনের উপস্থিতিতে পঁচতে থাকে তখন বাইপ্রোডাক্ট হিসেবে তৈরি হয় পানি, কার্বন ডাইঅক্সাইড এবং কিছু পরিমাণ তাপ। কিন্তু যখন এইসব জৈবযৌগ পঁচার সময় উন্মুক্ত পরিবেশের অক্সিজেন পায় না তখন? ধরুন এরা খোলা বাতাসে পঁচার বদলে কোনো পুকুর বা ডোবার পানির নিচে পঁচছে- সেই ক্ষেত্রে কী হবে? তখন বাইপ্রোডাক্ট হিসেবে তৈরি হবে মিথেন, কার্বন ডাইঅক্সাইড, নাইট্রোজেন, ফসফিন ইত্যাদি।

এই মিথেন এবং ফসফিন গ্যাস যখন পানি ছেড়ে বুদবুদের মাধ্যমে ভেসে উঠবে এবং খোলা বাতাসের অক্সিজেনের সংস্পর্শে আসবে তখন মিথেন গ্যাস ফসফিনের সাথে বিক্রিয়া করে নীল আলো উৎপন্ন করবে যেটাকে দেখা যাবে আশেপাশের বাতাসে ভেসে বেড়াতে। ফসফিন হচ্ছে দাহ্য গ্যাস যেটা বাতাসের সংস্পর্শে এলে স্বতস্ফূর্তভাবে জ্বলে ওঠে। যখন ফসফিন বাতাসে জ্বলতে থাকে তখন এটা সাদা ধোঁয়ার সৃষ্টি করে। ফলে সেই নীল আলোর চারপাশে একটা ধোঁয়ার মতো অবয়ব চোখে পড়াও বিচিত্র কিছু নয়। যখন কেউ সেটাকে ধরতে যাবে তখন তার উপস্থিতিতে মিথেন এবং ফসফিন গ্যাসের মিশ্রণটা চারপাশে ছড়িয়ে যাবে এটাই স্বাভাবিক। ফলে আলোটাও হারিয়ে যাবে। সুতরাং জিন-পরি ধরতে না পারার জন্যে দুঃখ করার কোনো কারণ নেই! এবার তো জেনে গেলেন আপনাদের আসল জিন-পরি হলো মিথেন আর ফসফিন! এমনকি আপনারা কৃত্রিমভাবে আলেয়া বানানোর চেষ্টাও করে দেখতে পারেন!

আরও পড়ুন: অ্যাকুয়াপনিক্স : ছাদে মাছ চাষ!

পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন:

মন্তব্য করুন: