অলৌকিক ঘটনা কিভাবে ঘটে? পর্ব-২

আপনি কোন এক জায়গায় যদি বলেন ভূত বলে কিছু নেই । তবে কেউ না কেউ প্রতিবাদ করবে আর বলবে আমি নিজে চোখে দেখেছি । তাকে তার অভিজ্ঞতা জিজ্ঞেস করা হলে বলবে  ছায়ামূর্তির মত অবয়ব দেখেছে । চোখের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল । হুট করে নাই হয়ে গেছে ।

সুইজারল্যান্ডের বিজ্ঞানীরা এক এপিলেপ্সিতে (Epilepsy) আক্রান্ত রোগীর মস্তিষ্কে বৈদ্যুতিক স্টিমুলেশান দেয়ার সময় তার প্রতিক্রিয়া জানতে চেয়েছিলেন। প্রতিক্রিয়া ছিলো ভয়াবহ। সেই রোগী জানালেন তিনি তার সামনে ছায়ার মত একটা অবয়ব দেখতে পাচ্ছেন যে কিনা সেই রোগীর প্রতিটা নড়াচড়ার হুবহু অনুকরণ করছে। যখন রোগী উঠে বসছেন তখন সেই ছায়ামানবটাও উঠে বসছে। যখন তিনি সামনে ঝুঁকে হাঁটু স্পর্শ করার চেষ্টা করছেন তখন ছায়ামূর্তিটাও তাই করছে। বিজ্ঞানীরা তখন রোগীকে একটা কার্ড দিয়ে সেটার লেখাগুলো পড়তে বললেন। কিন্তু তখন রোগী দেখলো ছায়ামূর্তিটা তার হাত হতে কার্ডটা টেনে নিয়ে যাবার চেষ্টা করছে!

আসলে যা ঘটেছিলো তা হলো, বিজ্ঞানীরা সেই রোগীর মস্তিষ্কের বামপাশের টেম্পোরোপ্যারাইটাল জাংশান (Left Temporoparietal Junction)-এ স্টিমুলেশান দিচ্ছিলেন। সহজ কথায় বলতে গেলে, এটা হচ্ছে আমাদের মস্তিষ্কের সেই অংশ যেটা পারিপার্শ্বিকতার সাপেক্ষে আমাদের শরীরের অবস্থান কোথায় এবং কি অবস্থায় আছে সেই তথ্য প্রতি মূহুর্তে আপডেট করে থাকে। আরো ভালোভাবে বলতে গেলে এটা আমাদের আপন অস্তিত্ব এবং অপরের অস্তিত্ব বুঝাতে সহায়তা করে। যখন বিজ্ঞানীরা এই অংশটায় স্টিমুলেশান দিচ্ছিলেন তখন এর পুরো কার্‍যপ্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটতে লাগলো। ফলে রোগী তার নিজের শরীরকে বুঝতে ব্যর্থ হলেন আর একই সময়ে তার দৃশ্যপটে একটা ছায়ামানবের জন্ম হলো যে কিনা ঐ রোগী যা করে সেটারই অনুকরণ করে চলে।

আপনি কি জানেন- এই পর্‍যন্ত যেসব স্থানে ভূতের দেখা পাওয়া গেছে দাবি করা হয়েছে, সেই সবকটা স্থানেই বিজ্ঞানীরা যন্ত্রপাতি দিয়ে প্রচন্ড প্রতিক্রিয়াশীল তড়িৎ চুম্বকীয় ক্ষেত্রের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছেন? এইসব ক্ষেত্রের উৎস কি সেটায় যাবার আগে ভূত দেখার আরেকটা কার্‍যকারণ উল্লেখ করে নেই। সেটা হলো ‘ইনফ্রাসাউন্ড (Infrasound)‘।

গবেষক ‘ভিক ট্যান্ডি’ তার ল্যাবরেটরিতে একাকী কাজে ব্যস্ত থাকার সময় হঠাৎ একটা ধূসর রঙের ছায়ামূর্তিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেন তার ডেস্কের কিনারা ধরে। প্রথমে তিনিও ধরে নিয়েছিলেন তার কর্মক্ষেত্রে নিশ্চয়ই ভূতের আছর হয়েছে। তাই সেদিনকার মত কর্মবিরতি ঘোষণা দিয়ে একলাফে সিঁড়ি এবং পরের লাফে তার গাড়িতে গিয়ে উঠলেন। কিন্তু বিজ্ঞানমনস্ক হওয়ায় তিনি ব্যাপারটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না। তাই পরদিন তিনি তার অফিসে গিয়ে কক্ষটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলেন। তখনই একটা ব্যাপার তার চোখে পড়লো। গবেষক ভিক ছিলেন ‘ফেন্সিং (Fencing)’ খেলার ভক্ত। তিনি তার ফেন্সিং খেলার স্টিলের তরবারিটা দেয়ালে ঝুলিয়ে রেখেছিলেন। তিনি খেয়াল করে দেখলেন সেটা নিজে থেকেই কেমন যেন কাঁপছে। তখনই পুরো ব্যাপারটা তার মাথায় ‘ক্লিক’ করে উঠলো। তিনি উপলব্ধি করলেন যে বলের কারণে তরবারিটা কাঁপছে, সেই বলের কারণেই তিনি ভূত দেখতে পেয়েছিলেন। ভিক আসলে ইনফ্রাসাউন্ডের কারসাজির শিকার!

আমাদের মানুষদের শ্রবণক্ষমতার সীমা নিম্নে ২০ হার্জ হতে উপরে ২০,০০০ হার্জ পর্‍যন্ত। ২০ হার্জের নিচের কোন শব্দই আমরা শুনতে পাইনা। এই সীমার নিচের শব্দকেই বলে ইনফ্রাসাউন্ড। আমরা ইনফ্রাসাউন্ড শুনতে পাইনা, কিন্তু সেটার কম্পন ঠিকই অনুভব করতে পারি। ইনফ্রাসাউন্ড প্রতিনিয়ত আমাদের মনকে নিয়ন্ত্রণ করছে। এই অতি মৃদু কম্পনের কারণে হঠাৎ বিষন্নতা হতে শুরু করে অস্থির অস্থির লাগা পর্‍যন্ত অনেক কিছুই ঘটতে পারে আপনার সাথে। ইনফ্রাসাউন্ডের কারণে অনেকে গাড়িতে চড়ার সময় বমি করে থাকেন। ডঃ রিচার্ড ওয়াইজম্যান বলেন, “আমরা এই তরঙ্গগুলোকে অনুভব করে থাকি সবসময়, বিশেষত আমাদের পাকস্থলীতে, এবং এর ফলে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া যেমন ঘটতে পারে (কোন কারণ ছাড়াই মনে ফূর্তিভাব চলে আসা) তেমনি নেতিবাচক অনুভূতিও হতে পারে (হঠাৎ অস্বস্তি লাগতে থাকা)। যদি আপনার পারিপার্শ্বিক পরিবেশ উপযুক্ত হয় তবে এই তরঙ্গরা আপনার মনে হঠাৎ তীব্র আতংকের সঞ্চারও করতে পারে”।

ইনফ্রাসাউন্ড প্রাকৃতিকভাবে উৎপন্ন হতে পারে ঝড়ো আবহাওয়া হতে (ভূত দেখার পারফেক্ট সময়), বিজলী চমকানো হতে, দমকা বাতাস হতে, এমনকি নিত্য ব্যবহার্‍য আসবাবপত্র হতেও! চলুন ফিরে যাই ভিক ট্যান্ডির ঘটনায়। তিনি যখনই ইনফ্রাসাউন্ডের ব্যাপারটা বুঝতে পারলেন তখনই তিনি খুঁজতে লাগলেন অফিসকক্ষে নতুন কি সংযোজন করা হয়েছে যার ফলে হঠাৎ এই তরঙ্গের আগমন। তিনি খুঁজে পেলেন একটা নতুন পাখা ভেন্টিলেশন সিস্টেমে যুক্ত করা হয়েছে। তিনি এই পাখাটার ব্যাপারে জানতেন না। যন্ত্রপাতি দিয়ে মেপে দেখলেন পাখার কারণে ঠিক ১৯ হার্জ সমমানের তরঙ্গ উৎপন্ন হচ্ছে, যা কিনা আমাদের নিম্নতম শ্রবণসীমা হতে মাত্র এক হার্জ কম। এই কম্পনাংকের তরঙ্গ ট্যান্ডির চোখকে মৃদু মৃদু কাঁপাচ্ছিলো যার কারণে তিনি চোখের সামনে উদ্ভট ছায়ামূর্তি দেখতে পাচ্ছিলেন। যখন ট্যান্ডি মেইন্ট্যান্যান্সের লোকজন ডাকিয়ে পাখাটাকে বন্ধ করালেন তখন অনুমান করুন কি ঘটেছিলো? আর কোন ভূতের অস্তিত্ব নেই!

একইভাবে ডঃ ওয়াইজম্যান  বিশ্বাস করেন এই কম্পনগুলোই আসলে প্যারানর্মাল বা অতিপ্রাকৃত ঘটনাবলীর জন্যে অধিকাংশে দায়ী। উদাহরণস্বরুপ, আন্ডারগ্রাউন্ডের দুইটা ভূতুড়ে জায়গা পরিদর্শন করতে গিয়ে তদন্তকারীরা দেখলো দুই জায়গাতেই টানেলের উপরের রাস্তার গাড়িঘোড়ার চলাচলের কারণে ইনফ্রাসাউন্ডের ব্যাপক উপস্থিতি।

পর্ব ১

Facebook Comments