অক্ষর মনে রাখতে সমস্যা- ডিসলেক্সিয়া

অক্ষর মনে রাখতে সমস্যা- ডিসলেক্সিয়া
 

বাংলাদেশের বাবা-মা এর ধারণা, তাদের বয়স হয়েছে বলে তারা সব জেনে গেছে আর তার মতই ছোট্ট বয়সেই সন্তান পড়তে লিখতে শিখে যাবে। অনেক সময় দেখা যায় বাচ্চা পড়া মনে রাখতে পারছেনা কিংবা যখন নতুন শব্দ শেখানো হয় তখন একবার লিখে পরেরবার আর পারছেনা । সবাই মনে করছে এ নিশ্চয়ই ফাঁকি দেবার অজুহাত? কিন্তু তা না-ও হতে পারে। এমন এক রোগ রয়েছে, যাতে কোনো লেখা পড়তে, বানান করতে সমস্যা হয়। এই নির্দিষ্ট শিক্ষণগত সমস্যাটিকে বলা হয় ডিসলেক্সিয়া।

এক্ষেত্রে লেখা পড়তে সমস্যা হয় বলে কোনোকিছু পড়ার পর তা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে শিশু উত্তর দিতে পারে না। এটি জীবনব্যাপী একটি ভোগান্তির নাম। কিন্তু এর মানে এই নয় যে এতে আক্রান্ত ব্যক্তি কম বুদ্ধিসম্পন্ন বা সমবয়সী কারো চেয়ে কম মেধা রাখে। বহু বিখ্যাত এবং সফল ব্যক্তিও ডিসলেক্সিক ছিলেন।

লিওনার্দো দা ভিঞ্চি ইতালীয় রেনেসাঁসের কালজয়ী চিত্রশিল্পী।তাঁর হাত থাকে যা কিছু বের হয়েছে পৃথিবীর শিল্পকলার ভান্ডার তাতে সমৃদ্ধ না হয়ে উপায় নেই । তাঁর একেকটা কাজ শতাব্দীর এক একটা আরাধ্য শিল্পকর্ম । ভিঞ্চির মত এমন প্রতিভাবান আর রহস্যময় শিল্পী সেই শতাব্দীতে খুব কম মানুষই ছিলেন । তাঁর ছবিগুলোতে উদ্ঘাটিত রহস্যের চেয়ে অনুদ্ঘাটিত রহস্য এখনো শিল্পবোদ্ধাদের গবেষণার বিষয় ।তার বিখ্যাত শিল্পকর্মগুলোর মধ্যে মোনালিসা, দ্য লাস্ট সাপার,সালভাতোর মুন্ডি উল্লেখযোগ্য।

যাই হোক,আমাদের এই লিওনার্দোর একটা সমস্যা ছিল তিনি ছোটবেলায় ঠিকমত পড়তে-লিখতে পারতেন না । চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় যেটাকে “ডিসলেক্সিয়া” বলা হচ্ছে । ডিজলেক্সিয়া একটি শিখতে না পারাজনিত সমস্যা। ২০০৭ সালে বলিউডে আমির খানের “তারে জামিন পার” নামে একটা মুক্তি পেয়েছিল যেখানে ৮বছরের একটা ছেলের এই সমস্যা থাকে । ছবিতে বাচ্চাটাকে দেখা যায় কিছু কিছু অক্ষর সে উল্টাভাবে লিখছে ।তাঁকে বারবার করে দেখিয়ে দেবার পরও একই ভুল করছে। তাতে তার বাবা-মা ভাবে সে ইচ্ছা করেই বদমাশি করছে । কিন্তু ব্যাপারটা তা নয় । তাঁর মস্তিষ্ক নির্দিষ্ট কিছু অক্ষর বা বর্ণকে ঠিকভাবে আয়ত্ব করতে পারে না । পড়ে একজন শিক্ষক তার এই অক্ষমতাকে ধরতে পারেন ।সঠিকভাবে গাইড করেন এবং একসময় সে আর আট-দশটা সমবয়সীদের মতই লিখতে-পড়তে শুরু করল ।

অক্ষর মনে রাখতে সমস্যা- ডিসলেক্সিয়া
অক্ষর মনে রাখতে সমস্যা- ডিসলেক্সিয়া

ডিসলেক্সিয়া  বাচ্চারা দেখা যায় পড়াশোনা এড়িয়ে চলছে। এছাড়াও এই সমস্যাটি থাকলে দেখা যায় যে বাচ্চারা সবকিছু দেরিতে শিখছে, যেমন কথা বলা, হামাগুড়ি দেওয়া, হাঁটা ইত্যাদি। বাম-ডান গুলিয়ে ফেলা, কোনো সংখ্যা বা অক্ষর উল্টো করে লেখা (যেমন ইংরেজি ‘b’কে ‘d’ লেখা বা ইংরেজি ‘6’কে ‘9’ লেখা) ইত্যাদি দিকভ্রান্তির ব্যাপারটিও দেখা যায়। বাক্য বা শব্দের ধ্বনিগত বিষয় তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। একটি শব্দে যদি দুটোর বেশি অংশ থাকে, তবে পুরো শব্দটি বলা তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। ডিসলেক্সিয়ার ক্ষেত্রে লিখিত নির্দেশনার চেয়ে মৌখিক নির্দেশনা অধিক ফলপ্রসূ হয়। তবে বিভিন্ন সৃজনশীল ক্ষেত্রে ডিসলেক্সদের দক্ষতা দেখা যায়।

১৮৭৮ সালে জার্মান স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ এডলফ কাসমাউল প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিদের স্নায়ুগত বিকলতা ও পড়তে না পাড়াজনিত সমস্যার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেন।তিনি দেখতে পান যে তার অধিকাংশ রোগীই ঠিকভাবে পড়তে পাড়ে না এবং প্রতাহ্যিক জীবনে ভুল শব্দ ভুল ক্রমে ব্যবহার করে।তিনি এ সমস্যাকে “শব্দ অন্ধত্ব “নামে অভিহিত করেন।
১৮৮৭ সালে জার্মান চক্ষু বিশেষজ্ঞ বার্লিন সর্বপ্রথম শব্দ অন্ধত্বের পরিবর্তে জার্মান শব্দ ডিজলেক্সিয়া ব্যবহার করেন।
৭ নভেম্বর ১৮৯৬ সালে প্রিংগেল মরগান ব্রিটিশ জার্নালে ডিজলেক্সিয়ার আক্রান্ত রোগের ব্যাপারে প্রথম প্রতিবেদন প্রকাশ করেন।

পৃথিবীর ইতিহাসে এমন অনেক বিখ্যাত কিছু মানুষ আছেন যারা এই সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিলেন । বিখ্যাত চিত্রকর এবং ভুবনখ্যাত ভাস্কর্য পাবলো পিকাসো, কার্টুন দুনিয়ার বাদশা ওয়াল্ট ডিজনি,প্রখ্যাত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন,বিদ্যুতের জনক টমাস আলভা এডিসন,বলিউড অভিনেতা অভিষেক বচ্চন ।

ডিজলেক্সিয়ার লক্ষণ

যেহেতু ডিজলেক্সিয়া কোন নির্দিষ্ট বয়সের মানুষ নয়, যেকোন বয়সের মানুষই আক্রান্ত হতে পারে। বয়সভেদে ডিজলেক্সিয়ার লক্ষণ বিভিন্নরকম হয়ে থাকে।
প্রি-স্কুল সময়েঃ

১। সহজ ছড়াগুলো বলতে না পারা(যেমনঃ টুইংকেল টুইংকেল),

২। বর্ণমালা শিখতে, পড়তে ও মনে রাখতে সমস্যা হয়,

৩। নিজের নামের অক্ষরগুলো পড়তে না পারা,

৪। Cat, Rat, Bat – এর মত সহজ শব্দগুলোও উচ্চারণ করতে সমস্যা হয়।

১ম শ্রেণীতে পড়ার সময়েঃ

১। ভেঙ্গে ভেঙ্গে আসা শব্দ বুঝতে না পারা,

২। পড়ার সময়ে শব্দ হারিয়ে যায়,

৩। শব্দের সাথে বর্ণ মেলাতে পারে না।

মাধ্যমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পড়ার সময়েঃ

১। খুব ধীরে পড়া,

২। অপরিচিত শব্দ পড়তে সমস্যা হওয়া,

৩। জোরে না পড়া,

৪। পড়ার আগ্রহ কমে যাওয়া,

৫। কোন কিছুর নাম না বলে, “ঐ জিনিস”, “ঐ বস্তু” বলে চালিয়ে দেয়া,

৬। কথা বলতে গেলেই থেমে থেমে যাওয়া এবং “উমম”, “ইয়ে” উচ্চারণ করা,

৭। শব্দ গুলিয়ে ফেলা,

৮। বড়, অপরিচিত শব্দ ভুলভাবে উচ্চারণ করা,

৯। কোন পড়া পড়তে, লিখতে বা প্রশ্নের উত্তর দিতে বেশী সময় নেয়া,

১০। তারিখ বা অন্যান্য নাম্বার মনে রাখতে না পারা,

১১। বাজে হাতের লেখা,

১২। বিদেশী ভাষা শিখতে সমস্যা হয়।

পূর্ণবয়সেঃ

১। মানুষের নাম, জায়গার নাম ভুলভাবে উচ্চারণ করা,

২। পুনরাবৃত্তি করতে সমস্যা,

৩। আনন্দের জন্য পড়া এড়িয়ে চলা,

৪। জোরে না পড়া,

৫। সবাইকে এড়িয়ে চলা,

৬। ‘b’ এবং ‘d’ – এর মধ্যে গুলিয়ে ফেলা,

৭। সবকিছুতে অগোছালো হয়ে পড়া।

মুক্তির উপায়

সঠিক শিক্ষণপদ্ধতির মাধ্যমে শিশু থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্ক- সবাইকেই ভালো করে পড়তে ও লিখতে শেখানো যাবে। বলিউডে আমির খান অভিনীত ‘তারে জামিন পার’ সিনেমাটিতে এই সমস্যার উপর ভিত্তি করে নির্মিত। সেখানে বেশ ফলপ্রসূ কিছু সমাধানের কথা বাতলে দেওয়া হয়েছে। যেমন একইসাথে শ্রবণোদ্দীপনার মাধ্যমে পড়া, যাতে করে ডিসলেক্সিক ব্যক্তি কী পড়ছে, তা কানেও শুনতে পায় এবং এটি বারবার করার পর শব্দগুলো তার কাছে আর অপরিচিত লাগে না। এই অনুশীলন চালু রাখার মাধ্যমে সমস্যাটি থেকে অনেকটাই বেরিয়ে আসা সম্ভব।

এছাড়া প্রতিটি অক্ষর ও সংখ্যা বড় বড় করে একটি বর্গাকার ক্ষেত্রের মধ্যে বারবার লেখানো, যাতে করে তার কাছে এর আকৃতি ধরতে পারা সহজ হয়, অস্পষ্টতা কেটে যায়। শিশুদের ক্ষেত্রে শিক্ষক এবং বাবা-মায়ের ভূমিকা এখানে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ শিক্ষণ প্রক্রিয়া তাদের দ্বারাই মূলত পরিচালিত হয়। তারা ডিসলেক্সিয়া সম্পর্কে সকল প্রকার অনুসন্ধান করে এর লক্ষণ, কারণ সচেতন হয়ে উপযুক্ত শিক্ষাদান পদ্ধতি প্রয়োগ করলে এই সমস্যা ধীরে ধীরে কেটে যাবে। আর প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে নিজেকে সচেতন হতে হবে এবং নিজের সবচেয়ে ভালো দক্ষতা বের করে আনতে হবে। এভাবেই ডিসলেক্সিয়া থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

সূত্রঃ roar media, platfrom

আরো পড়ুনঃ অলৌকিক ঘটনা কিভাবে ঘটে? পর্ব-১

Facebook Comments
পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন: